রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের সুরে আছে এক অনন্ত শক্তি। বাংলায় রাধাকৃষ্ণের মাধুর্যভাবের সূচনা বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রথম প্রভাতে। কবি জয়দেবের কালজয়ী সৃষ্টি ‘গীতগোবিন্দ’-এ রাধা ও কৃষ্ণের মিলন-বিরহের প্রথম অপূর্ব কাব্যিক প্রকাশ ঘটে। সংস্কৃত ভাষার সেই দিব্য সুর পরবর্তীকালে বাংলার কবিদের হাত ধরে সহজ ও গভীর রূপ লাভ করে। বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের পদাবলিতে রাধা কেবল দেবী নন, তিনি বিরহ, আকুলতা, মান, অভিমান ও আত্মনিবেদনের এক পূর্ণাঙ্গ মানবিক প্রতিচ্ছবি। মানুষের হৃদয়ের পরম আকাঙ্ক্ষাকে তাঁরা রূপ দিয়েছেন পরমতত্ত্বের অভিমুখী এক প্রেমে। যে মাটিতে তত্ত্বকথা গান হয়ে ওঠে, দর্শন রূপ নেয় সুরে, সেখানেই জন্ম নেয় প্রেমভক্তির অমৃতধারা। রাধার প্রেম কেবল পৌরাণিক আখ্যান নয়, তা বঙ্গজীবনের গভীরতম আধ্যাত্মিক আকুলতার এক মহাকাব্যিক সুর।
রাধাষ্টমীর পুণ্যতিথিতে বাংলার চৈতন্যে আজ পুনরায় ধ্বনিত সেই অতিপ্রাকৃত প্রেমেরস। এই প্রেমসাধনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। নবদ্বীপের মাটিতে তাঁর আবির্ভাব বৈষ্ণব ভক্তিআন্দোলনকে এনে দেয় এক নতুন মাত্রা। মহাপ্রভুর দর্শনে রাধা হলেন ভক্তির সর্বোচ্চ আদর্শ। কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তির মূর্ত রূপ। ভক্তের কাজ পরমেশ্বরের সুখে নিজেকে বিলীন করা—এই তত্ত্বকেই তিনি সংক্রামিত করেছিলেন শ্রীনামসংকীর্তনের মাধ্যমে। সংকীর্তন আর কেবল ভজন রইল না। তা হয়ে উঠল সমবেত নৃত্য, গীত ও অনুভূতির এক জীবন্ত দলিল। পদাবলি কীর্তনের মধ্য দিয়ে এই বিরহ ও মিলনের সুর বাংলার প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি মন্দিরে ছড়িয়ে পড়ল। পরবর্তীকালে বাংলার এই ঐতিহ্য বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বাংলার এই মহাভাব ও সংকীর্তন আন্দোলনকে পৌঁছে দেন সমগ্র বিশ্বে। ১৯৬৬ সালে নিউইয়র্কে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ মায়াপুরের বিশ্বকেন্দ্রিক বৈষ্ণবধামে তার পূর্ণ বিকাশ দেখা যায়। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ আজ রাধানামের সুধায় আপ্লুত।
