শরতে উৎসবের ছড়াছড়ি। দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী, জগদ্ধাত্রী থেকে কার্তিক। একের পর এক দেবদেবীর পুজো এই সময়েই হয়। পণ্ডিতদের মতে, দুর্গাপুজোর একটি নির্দিষ্ট সময়কাল রয়েছে। তা হল ৬ আশ্বিন থেকে ৬ কার্তিকের মধ্যে। বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী এই সময়টাই হল ‘ভরা শরৎ’। রাজসিক উমার পুজোর জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর নেই।ফিরে যাওয়া যাক ঋগ্বেদের যুগে। তখন বছর গোনা হত এক শরৎ থেকে অন্য শরতে। অর্থাৎ, শরৎকালই ছিল নববর্ষের সূচনা। বাজসনেয়ী সংহিতায় একটি শ্লোক পাওয়া যায়। ‘ইষশ্চোর্জশ্চ শারদাবৃতু’। ইষ মানে আশ্বিন। আর উর্জ মানে কার্তিক। বৈদিক যুগে এই দুই মাস নিয়েই ছিল শরৎকাল। বেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘শারদেন ঋতুনা দেবাঃ’। এর অর্থ হল, শরৎকালই দেব-আরাধনার শ্রেষ্ঠ সময়। তাই রামচন্দ্রের পুজো ‘অকাল বোধন’ হলেও, শরৎই আসলে আরাধনার প্রকৃত লগ্ন।
শিউলির গন্ধ। কাশফুলের ঢেউ। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। মর্ত্যে উৎসবের আবাহন। কিন্তু স্বর্গে তখন অন্য চিত্র। দেবতারা নিদ্রামগ্ন। পুরাণ মতে, আষাঢ় থেকে কার্তিক— এই সময়কাল দেবতাদের ঘুমের সময়। শাস্ত্রীয় ভাষায় যাকে বলে ‘নিদ্রাকাল’। ঘুমন্ত দেবতাকে অকালে জাগিয়েই শুরু হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। রাবণবধের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র করেছিলেন ‘অকাল বোধন’। বসন্তের আদিকালীন বাসন্তী পুজোকে ছাপিয়ে সেই অকাল বোধনই আজ বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। কিন্তু যাকে ‘অকাল’ বলা হচ্ছে, সেটিই কি আদৌ আরাধনার উপযুক্ত সময়?এর নেপথ্যে রয়েছে প্রকৃতির অদ্ভুত এক সমীকরণ ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। বর্ষার শেষে প্রকৃতি শান্ত হয়। চারিদিক সবুজে ভরে ওঠে। বৃষ্টির ভ্রুকুটি আর থাকে না। নদনদীও শান্ত রূপ নেয়। পথঘাট শুকনো থাকে। নতুন করে বানের জলে ভেসে যাওয়ার ভয় থাকে না। আবহাওয়া থাকে মনোরম। না-শীত, না-গরম এক স্নিগ্ধ পরিবেশ। মাঠে তখন ফসলের প্রাচুর্য। ভাদ্র মাসে পচানো পাট বিক্রি করে কৃষকের ঘরে ঘরে লক্ষ্মী আসে। অন্ন ও বাসস্থানের নিশ্চিন্ততা তৈরি হয়। আর পেটে ভাত থাকলেই তো মানুষের উৎসব ও পার্বণের প্রয়োজন পড়ে। মানুষের এই নিশ্চিন্তির সময়টাই তাই দেব-আরাধনার যথার্থ সময়। অকালের বোধন আসলে প্রকৃতির নিয়মে এক নিখুঁত লগ্ন।
