ভক্তদের ‘তমোগুন’ থেকে ‘সত্ত্বগুণে’ নিয়ে যাওয়ার প্রতীক হলো এই দুর্গামূর্তি। প্রতিমায় মৃন্ময়ী রূপ। দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী। পায়ের নীচে দলিত মর্দিত হচ্ছে মহিষাসুর। এই রূপ আমরা আবাল্য দেখে আসছি। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে এক নিগূঢ় শাস্ত্রীয় দর্শন। আধ্যাত্মিক স্তরে এই প্রতিমা আসলে মানবজীবনেরই এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সাধকের সঙ্গে জগজ্জননীর সম্পর্কটি এখানে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। মায়ের দশটি হাত কিসের প্রতীক? শাস্ত্র বলছে, এই দশ হাত আসলে আমাদের দশটি ইন্দ্রিয়। এই ইন্দ্রিয়গুলির মাধ্যমেই আমরা যাবতীয় ঐহিক সুখ অন্বেষণ করি। তা ভোগ করি। কিন্তু ভোগের সঙ্গেই লেপটে থাকে জাগতিক দুঃখ। মায়ের হাতের ওই তীক্ষ্ণ অস্ত্রশস্ত্রগুলি আমাদের সেই ভোগের বিষাদ থেকে সর্বদা রক্ষা করে।
দেবি মহামায়া মূলত তমোপ্রধান এবং রজোগুণাশ্রিত। আক্ষরিক অর্থে আমরা, সাধারণ মানুষেরাই তাঁর বাহন। আমাদের অন্তরের পশুভাব যখন প্রবল হয়, তখন আমরাই হয়ে উঠি সিংহ। তখন আমরা তমোগুণের বশবর্তী হই। সম্পূর্ণ নির্বিচারে জিহ্বা এবং উপস্থের লালসায় মত্ত হয়ে থাকি। কেবলই ভোগসুখ খুঁজি। এই উদ্দাম ভোগে যখনই কোনও বাধা আসে, তখনই অসুরের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তখন আমাদের ভিতরের পশুসত্তা সেই শত্রুকে বিনাশ করতে উদ্যত হয়। অসুর আসলে দেবতাদের প্রতি হিংসাপরায়ণ। তারা যজ্ঞ বা পুণ্যকর্ম থেকে শত যোজন দূরে থাকে। আমাদের ভিতরে প্রতিনিয়ত এই অসুর ও সিংহের বাস। এই প্রবল অজ্ঞানতা ও পশুভাব থেকে মুক্তির উপায় কী? পথ দেখাচ্ছে মায়ের দু’টি চরণ। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় মায়ের এই দুই চরণ হল যোগশাস্ত্রের ‘যম’ এবং ‘নিয়ম’। দেবী যেমন তাঁর পায়ের চাপে অসুর এবং সিংহকে অবদমিত করে রাখেন, সাধককেও ঠিক তেমনই করতে হয়।
