দোষ কারও নয় গো মা— নাহ্ মা ছিন্নমস্তার কাছে বোধহয় আর এ গান গাইতে পারবেন না নারায়ণ শাস্ত্রী। গাইবেনই বা কী করে, এত বছর ধরে শুধু মায়ের মুখ চেয়েই তো সব অত্যাচার, অপমান মুখ বুঝে সহ্য করে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু এ বার সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে তাঁর। সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছেন মন্দিরের পুরোহিত নারায়ণ।
এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। প্রশাসনের সর্বোচ্চস্তরের এক কর্তা বলেন, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী (Chief Minister Mamata Banerjee) এই ধরনের অনিয়মের বিপক্ষে। আমাদের নজরে এসেছে বিষয়টি। খোঁজ করা হচ্ছে। আসলে এখনও কোনও ভক্ত লিখিত অভিযোগ না করায় সমস্য হচ্ছে। তবে প্রশাসন (Burdwan District Administration) বা পুলিশ হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। নির্দিষ্ট একটি ক্লাব নিয়ন্ত্রক হলেও এই মন্দিরের সঙ্গে বর্ধমানের সম্মান জড়িয়ে আছে।
নিজের কষ্টের কথা কিছুটা বলেছেন পুরোহিত। সেই সূত্রেই ইঙ্গিত মিলেছে কী কাণ্ডকারখানা চলছে মন্দিরকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মা ছিন্নমস্তাকে সামনে রেখে রীতিমতো ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন গুটিকয়েক মানুষ। জমেছে দুর্নীতির পাহাড়।
আর এই আর্থিক অনিয়ম নিয়েই জমছে ক্ষোভ। অভিযোগ, গত দশ বছর ধরে ক্লাব কর্তারা মন্দির বা ক্লাবের আয়-ব্যয়ের কোনও হিসাব দিতে পারেননি। বলা ভাল দিচ্ছেন না। ক্লাবের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তার কথায়, ক্লাব ফান্ড থেকে কখনই মন্দিরের কোনও কাজে কিংবা উতসবে খরচ করা হয়নি। বরং মায়ের পুজোর নাম করে লক্ষ লক্ষ টাকা বাজর থেকে তোলা হয়েছে। মায়ের পুজোর খরচ জুটে গিয়েছে অচিরেই। বরং পুজোর নামে তোলা টাকাই ক্লাবের হাতে গিয়েছে।
বর্ধমান (Burdwan) শহরের মুচিপাড়ায় রয়েছে মা ছিন্নমস্তার মন্দির (Maa Chinnamasta)। বিগ্রহ অষ্টধাতুর তৈরি। সে ভাবে কোনও পরিচালন কমিটি নেই মন্দিরের। যেহেতু সবুজ সংঘ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে এই মন্দির, তাই মন্দির পরিচালনার ভার আজ ২৫ বছর ধরে রয়েছে ক্লাবেরই হাতে। (Sabuj Sangha)
স্থানীয় সূত্রের খবর, এই মন্দিরকে রীতিমতো ব্যবসায় পরিণত করেছেন ক্লাবের জনৈক শকুনি মামা। নাম ভোলাকান্ত গাঁজা (নাম পরিবর্তিত)। এই ভোলা মোটেও ভোলেভালা নন। গুটিকয়েক অনুচর (নন্দী, ভৃঙ্গী-সহ) জুটিয়ে ভোলেবাবা মাকে সামনে রেখে লক্ষ্মীলাভে ব্রতী হয়েছেন। ক্লাবের এক সদস্য বলেন, আসলে ক্লাব নিয়ন্ত্রিত সম্পাদকের মাধ্যমে। সম্পাদক মানুষটি ভাল হলেও এই শকুনি মামাই তাঁকে উস্কে-প্ররোচনায় ফেলে অপকর্মগুলি চালান বহাল তবিয়তে।
মন্দিরে আয় নেহাত কম নয়। ভক্তদের দান-ধ্যানে উপচে পড়ে মায়ের ভান্ডার। আর ভান্ডারে হাত পড়ে শকুনি মামার। কী ভাবে? স্পষ্ট জবাব মেলে না। কিন্তু মায়ের জন্য একটা টাকাও খরচ করেন না শকুনি মামা বা ক্লাবের কর্তারা। উল্টে ক্লাবের বাৎসরিক পুজোর খরচ জোগান মা নিজেই। এক, দু’বছর নয়। ১০-১১ বছর ধরে চলেছে এই ব্যবস্থা। মন্দিরে অগুণিত ভক্ত কখনও চাল, কখনও ডাল দিয়ে যান। কিছু রাইস মিল থেকেও তা আসে। কিন্তু তা ক্লাবে নেমেই চলে যায় ক্লাবের সুরক্ষিত কক্ষে। সেখান থেকে
চলে যায় অন্যত্র। মায়ের জোটে না কিছুই।
যদি চিনতে চান ওই শকুনি মামাকে,তবে চলে আসুন মন্দির প্রাঙ্গনে। যে সময়েই আসুন দেখা পাবেন মায়ের মূর্তির আর ওই শকুনি মামার। মন্দিরে কখন কোন মহিলা এলেন, তিনি কোন পোষাকে এসেছেন, কেমন দেখতে কিংবা মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে কী কথা বললেন বা প্রণামী থালায় কী দিলেন, সবই ওই মামার নখদর্পনে। আসলে নিন্দুকেরা বলেন, পাওনাদারদের ভিড় এড়াতে এবং তাঁদের হাত থেকে পিঠ বাঁচাতেই ক্লাবকে আঁকড়ে রেখেছেন তিনি। পাওনাদারদের ঠেকানো যাচ্ছে আর মন্দির থেকে পকেট গোছানো যাচ্ছে, বলছেন অনেকেই।
পুরোহিত নারায়ণের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক অনেক দিনের। তাই নিজের খরচ মায়ের নিত্যদিনের সেবা করেন তিনি। এ হেন পুরোহিতকে সরানোর মতলব আঁটছেন শকুনি মামা। কারণে অকারণে তাঁকে অপদস্থ করা হচ্ছে। আসলে তাড়িয়ে দেওয়া ফিকির খুঁজছেন ভোলেবাবা। কারণটা স্পষ্ট। মা ছিন্নমস্তার সঙ্গে নারায়ণের যোগাযোগ ছিন্ন হলে ব্যবসায় আর কোনও বাধা থাকবে না। আপদ বিদেয় হলে নিশ্চিন্ত হবেন গাঁজাবাবু।
মায়ের নামে এই বিপুল আয় হলেও নিত্যদিনের পুজোর খরচ, নৈবেদ্য, দুপুরের অন্নভোগ বা সন্ধ্যারতি-লুচি মিষ্ট ভোগের খরচ জোটাচ্ছেন পুরোহিতই। এমনকী, ক্লাব ও মন্দিরের বিদ্যুত বিল দিতে হয় পুরোহিতকেই। ক্লাবের আয় থাকলেও তাঁরা দিতে অপারগ। নিত্যদিনের প্রণামী থেকেই পুরোহিতকে চালাতে হয় এই বিপুল খরচ। পুরোহিত এমনটাই লিখেছেন সোস্যাল মিডিয়ায়।
কিন্তু মজার কথা হচ্ছে ক্লাবেরই দুই কর্তা মন্দির চালানোর জন্য পৃথক কমিটি গড়ে দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা দিতে অস্বীকার করেন শকুনি মামা ও সম্পাদক বলে অভিযোগ। কমিটিই চেয়েছিল নির্দিষ্ট আইন মেনে মন্দিরের আয়ের হিসাব রেখে তার থেকে মন্দিরের নিত্যদিনের খরচ চালাতে। কিন্তু পরিচলাকেরা রাজী হননি। অভিযোগ, মন্দির চলে গেলে ওই বাবুদের ব্যক্তিগত আয়ে কোপ পড়বে বলেই তা করা হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, গাঁজাবাবু বা প্রধান কর্তার এ কাজকর্ম কী ভাবে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন? কেউ কিছু বলছে না কেন। উত্তর পেতে গেলে ইতিহাসের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
আগে এই ক্লাবের কোনও রাজনৈতিক রং ছিল না। সামাজিক কাজকর্ম আর দুর্গাপুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ক্লাবের পরিধি। বেশ কয়েক বছর আগে জমি বিবাদে জড়িয়ে পড়ে ক্লাব। সে সময় ক্লাব কর্তৃপক্ষ স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক খোকন দাসের (Khokon Das) সাহায্য নেন। বিপদ কেটে যায়। কিন্তু ক্লাবের গায়ে লেগে যায় রাজনীতির রং। বর্তমানে ক্লাবের সম্পাদক বিধায়কের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। ক্লাবের পদে থাকার পাশাপাশি ক্লাবের প্রতিটি অনুষ্ঠানে বিধায়কের উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর হাত ধরেই ক্লাব বিভিন্ন সরকারি অনুদান বা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা কেউই গাঁজাবাবুর কাজকর্মের প্রতিবাদ করেন না। তাই ধরাকে সরা জ্ঞান করে ভোলেবাবা মাকে নিয়ে অর্থ রোজগারে নেমে পড়েছেন। ভয়ে ক্লাব সদস্যরা মাঝে মধ্যে প্রতিবাদে নামলেও বড়সড় পদক্ষেপ করতে পারেননি।
মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে পুরোহিতদের কল্যাণে উদ্যোগী হচ্ছেন সেখানে রাজ্যেরই এক মন্দিরের পুরোহিত নিজের পয়সায় মায়ের সেবা করে প্রতিদানে পাচ্ছেন অপমান আর লাঞ্ছনা। বিধায়ক কি সত্যি জানেন না কী চলছে মন্দিরে। কী করছেন ভোলেবাবা বা ওই ক্লাব কর্তা। যদি জানেন তা হলে এতদিন এর প্রতিকারে উদ্যোগী হননি কেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
পাপের ঘড়া বোধহয় পূর্ণ হয়ে এসেছে। মানুষ এ বার চিনে নেবে গণশত্রুদের। এমনটাই বলছেন মা ছিন্নমস্তার ভক্ত ও ক্লাব সদস্যদের একাংশ।
