দুর্গাপুজোর সঙ্গে বেলগাছ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কিন্তু কিভাবে এই কলাগাছ যুক্ত হয়ে গেলো দুর্গাপূজার সঙ্গে? এই নিয়ে পুরানের এক সুন্দর গল্প আছে। শরৎ আসে মেঘের খেয়ায় চেপে। চারদিকে কাশের মেলা। শিউলির গন্ধে বাতাস মেতে ওঠে। মা উমা মর্ত্যে পা রাখেন। ঢাকের কাঠিতে জাগে সুর। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলতলাতেই হয় দেবীর প্রথম আগমন। সেখান থেকেই শুরু হয় সমস্ত পুজো। বেলগাছ ছাড়া কি তবে দুর্গাপুজো একেবারেই অসম্ভব? দেবী দুর্গার রূপ-মাধুর্য আর মহাশক্তির আবাহনে কেন জরুরি বেলগাছ? সনাতন বিশ্বাসে দেবলোক ও মর্ত্যলোকের সময়ের হিসেব ভিন্ন। মানুষের এক পূর্ণ বছর দেবতাদের কেবল একটি অহোরাত্র। উত্তরাংশের মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছ’মাস দেবতাদের দিন। আর দক্ষিণায়নের শ্রাবণ থেকে পৌষ হল দেবতাদের ঘোর নিদ্রার রাত। প্রাচীন নিয়ম মেনে মহামায়ার আরাধনা হত বসন্তকালে, যখন দেবতারা জাগ্রত থাকেন। তবে লঙ্কাজয়ের উদ্দেশ্যে রামচন্দ্র যখন দেবীদুর্গার শরণাপন্ন হন, সময়টি ছিল আশ্বিন মাস। অর্থাৎ দেবতাদের নিশি যাপনের কাল। ঘোর নিদ্রায় মগ্ন দেবীকে অকালে জাগিয়ে তোলার সেই কঠিন প্রয়াসই শাস্ত্রে ‘অকালবোধন’ আর শরৎকালের পুজো ‘শারদীয়া’ নামে পরিচিত।
নিদ্রাতা মহাশক্তিকে জাগ্রত করা তো সহজ কথা নয়। তাই দেবীকে জাগ্রত করতে আগে ব্রহ্মাকে দেবীস্তুতি শোনান শ্রীরামচন্দ্র। তাঁর আকুল প্রার্থনায় ব্রহ্মা সমাহিত হয়ে ধ্যানে মগ্ন হলেন। ধ্যানের অলৌকিক আলোয় তিনি পৌঁছে গেলেন সাগরের তটে, যেখানে পুজোয় বসেছেন রামচন্দ্র। তিনি দেখলেন, সৈকত পেরিয়ে গভীর এক অরণ্যে বেলগাছের নীচে খেলছে আট-দশ বছরের এক অপরূপা বালিকা। ব্রহ্মা উপলব্ধি করলেন, এই বালিকাই সাক্ষাৎ গৌরী। ব্রহ্মার দৃষ্টিমাত্রই সেই বালিকা বিলীন হয়ে গেল বেলগাছের পাতার আড়ালে। সেই অলৌকিক ক্ষণ থেকেই সূচনা বেলগাছের পরম মাহাত্ম্যের। ব্রহ্মা নির্দেশ দিলেন, মর্ত্যে দেবীর অধিবাস ও বোধন হতে হবে এই শ্রীফল বৃক্ষের তলদেশেই। কারণ, ব্রহ্মার আহ্বানে দেবী প্রথম দেখা দিয়েছিলেন বিল্বপত্রের আড়ালেই, এক কুমারী কন্যারূপে।সেই পৌরাণিক স্মৃতি বহন করে আজও দুর্গাপুজোর সূচনায় ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলগাছ—অথবা তার নবীন শাখা—পূজাসংবলিত করে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। সংকল্প, বোধন, অধিবাস আর আমন্ত্রণের মাধ্যমে দেবী বেলতলায় প্রথম আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই তিনি প্রবেশ করেন পূজা মণ্ডপে। বেলগাছ ছাড়া শারদোৎসবের এই মহাশক্তির আবাহন তাই শাস্ত্র মতে সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ।
