আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। আমরা সারা বছর ধরে অপেক্ষা করি এই পাঁচ দিনের জন্য। অঞ্জলি শেষে ভক্তদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওনা পুজোর চরণামৃত। পুজোমণ্ডপে লাইন দিয়ে অঞ্জলির পর এক ফোঁটা চরণামৃত পাওয়ার ব্যাকুলতা সবার মধ্যেই থাকে। কিন্তু জানেন কি, এই চরণামৃতের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল রাজকীয় আয়োজন? এটি আসলে দুর্গার মহাস্নানের পবিত্র জল। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে পূজার প্রথমে সংকল্প পূর্বক নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ করে দেবী দুর্গাকে স্নান করানো হয়। কালিকাপুরাণে রয়েছে,
“শ্রীচন্দনপ্রতিষ্ঠে বা লেপয়েৎ প্রতিমাতনৌ।
স্বস্তিকস্থাপিতে খড়্গে স্নাপয়েদ্দর্পণে(হ)ত বা।।”
অর্থাৎ স্বস্তিক বা চন্দনলেপিত প্রতিমায় দেবীর স্নান প্রশস্ত। কিন্তু মৃন্ময়ী প্রতিমায় সরাসরি জল ঢালা সম্ভব নয়। তাই দর্পণে দেবীর বিম্ব প্রতিফলিত করে স্নান করানো হয়। কালিকাপুরাণ মতে, খড়্গ বা স্বস্তিকচিহ্ন আঁকা চন্দনেও স্নানের বিধান রয়েছে। দুর্গাপুজো হল অশ্বমেধ যজ্ঞের তুল্য। সৃষ্টিজগতের সমস্ত উপাদানই আদ্যাশক্তির রূপ। তাই পৃথিবীর নানা প্রান্তের পবিত্র বস্তু সমর্পণ করেই এই স্নান সম্পন্ন করা হয়।
স্নানের আগে দেবীর দন্তধাবন করানো হয়। আট আঙুল সরু বেল কাঠ দিয়ে দেবীর মুখ প্রক্ষালন করা হয়। এর পর দেওয়া হয় গরম জল। ত্বকের পরিচর্যায় নিবেদিত হয় তেল, কাঁচা হলুদ, তিল তেল ও বিষ্ণুতেল।এর পর শুরু হয় মৃত্তিকা প্রলেপ। এই মাটি সাধারণ নয়। রাজদ্বারের মাটি, চতুষ্পথ, রাজপথ, গজদন্ত ও বরাহদন্তের উপড়ে আনা মাটি। সঙ্গে লাগে বেশ্যাদ্বার, নদীর উভয় কূল, উইয়ের ঢিবি ও সর্বতীর্থের মৃত্তিকা। প্রকৃতির সমস্ত শক্তিকে দেবীর অঙ্গস্পর্শ করানোই এর মূল উদ্দেশ্য। রোগভোগ থেকে দেবীকে মুক্ত রাখতে নিবেদন করা হয় ‘পঞ্চগব্য’— দুধ, দই, ঘি, গোময় ও গোমূত্র। আর ত্বকের সার্বিক সুরক্ষায় লাগে ‘পঞ্চকষায়’। জাম, শিমূল, বেড়েলা, বকুল ও টোপাকুলের ছাল দিয়ে তৈরি হয় এই কষায়। সঙ্গে যুক্ত হয় সর্বৌষধি ও মহৌষধি। এই সমস্ত উপকরণ দেবীকে সর্বরোগ মুক্ত ও তেজস্বী করে তোলে।
