বাংলায় দুর্গাপূজা নিয়ে আছে বিভিন্ন লৌকিক বিশ্বাস ও কিংবদন্তি। তেমনই এক বিশ্বাস আছে আসানসোলের হাজরা বাড়িতে। বাংলায় মৃন্ময়ী রূপের অভাব নেই। কিন্তু যেখানে মৃণ্ময়ী নয়, বরং অখণ্ড প্রাকৃতিক রূপেই দেবী বিরাজমান, সেখানেই জেগে ওঠে লোকবিশ্বাসের আদি শক্তি। আসানসোলের ঊষা গ্রামের নিউ ঘুসিক গ্রামে দুর্গাপুজো (Durga Puja) মানেই তাই এক অদ্ভুত অলৌকিকতার প্রকাশ। এখানে ঢাকের কাঠি পড়ে, বাতাসে ধূপ-ধুনোর সুবাস ছড়ায়, কিন্তু প্রতিমাগড়ার কারিগর ঘরে থাকেন নিষ্ক্রিয়। কারণ, হাজরা পরিবারে দেবী দুর্গা পূজিত হন আক্ষরিক অর্থেই এক জীবন্ত উইঢিবিতে! প্রায় দুই শতক আগের কথা। তখন হাজরা পরিবারে নিয়ম মেনেই মাটির প্রতিমা গড়ে পুজো হত। কিন্তু হঠাৎ একদিন ঘোর দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার মতো এক ঘটনা ঘটে গেল। পুজোর রাতে নৈবেদ্য সাজানোর সময় হঠাৎ প্রদীপের শিখা থেকে আগুন লেগে গেলো প্রতিমার চুলে।
শাস্ত্রমতে, অঙ্গক্ষত বা পোড়া প্রতিমায় দেবীর আবাহন নিষিদ্ধ। অগত্যা সে বছরই প্রতিমা পুজো বন্ধ হয়ে স্থান পেল ‘ঘটপুজো’। তবে গল্পের মোড় ঘুরল এর পর। হরিপদ হাজরার পর পুজোর ভার যখন দিবাকর হাজরার হাতে, তখন মন্দিরের চাতালে দেখা দিল নতুন এক অলৌকিক চিহ্ন। রাতের অন্ধকারে চাতালের বুকে জেগে উঠল এক উইয়ের ঢিবি। দিনে দিনে তা আয়তনে বাড়তে লাগল। পোকার উপদ্রব ভেবে দিবাকর যখন সেটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, তখনই পেলেন স্বপ্নাদেশ। দেবী যেন স্বয়ং জানালেন, এই প্রকৃতির রূপেই লুকিয়ে রয়েছে তাঁর পরম উপস্থিতি। আশ্চর্যজনক ভাবে, সকালে উঠে দেখা গেল, মূল ঢিবির পাশাপাশি যেন ফুটে উঠেছে চার সন্তানের অবয়ব— গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের মুখের মতো ছোট ছোট আরও কয়েকটি ঢিবি! ব্যস, আর সন্দেহ রইল না। বস্ত্র ও অলঙ্কারে মুড়ে শুরু হল উইঢিবির মাতৃপুজো।
