অপেক্ষার আর ক’দিন। মণ্ডপে আবিভূর্তা হবেন মহামায়া। দশভুজা দেবীর দিকে অপলক চেয়ে থাকবে আপামর বাঙালি। চোখ ফেরানো যাবে না আদ্যাশক্তির সেই রূপের থেকে। কিন্তু দেবীর এই রণরঙ্গিনী রূপের পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন মহাতেজস্বী শ্বেত সিংহ। হিমালয় রাজ স্বয়ং দেবীকে এই ভয়ঙ্কর বাহনটি উপহার দিয়েছিলেন। প্রথম দর্শনে যা নেহাতই এক হিংস্র পশুপতি, শাস্ত্রের অন্দরে ঝুঁকলে, সেই সিংহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দেবসমাজকে অবস্থান করতে দেখা যায়। পুরাণকথা পর্যালোচনা করলে এক অবিশ্বাস্য তথ্য উঠে আসে। বাহন সিংহের গ্রীবায় মধুসূদন বিষ্ণু, মস্তকে স্বয়ং নীলকণ্ঠ শিব, আর ললাটে বিরাজ করছেন দেবী গিরিজা। শুধু তাই নয়, তাঁর বক্ষঃস্থলে স্বয়ং শারদা, কব্জিতে ষড়ানন কার্তিক এবং পার্শ্বদেশে বিরাজমান নাগকুল। কর্ণদ্বয়ে স্থান পেয়েছেন স্বর্গবৈদ্য অশ্বিনীকুমারদ্বয়। দেবীবাহনের এই অভাবনীয় দৈব বিন্যাস যেন সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের এক অদ্ভুত প্রতীক।
সিংহটি কেবল তেজের প্রতীক নয়, বরং তিনি সর্বদেবময় সনাতন শক্তির একক রূপ। তাঁর নয়নযুগলে চন্দ্র ও সূর্যের তেজ। দন্তাবলীতে অষ্টবসু এবং জিহ্বায় জলদেব বরুণ বিরাজিত। সিংহের এক হুঙ্কারেই প্রকাশিত হন দেবী চণ্ডিকা। গণ্ডদ্বয়ে যক্ষ ও যমরাজ, ওষ্ঠে দুই সন্ধ্যাদেবী এবং পৃষ্ঠদেশে স্থান পেয়েছেন স্বর্গের অধিপতি দেবরাজ ইন্দ্র। এমনকী সিংহের শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশেও লুকিয়ে রয়েছে সৃষ্টি ও প্রকৃতির রহস্য। তাঁর গ্রীবাসন্ধিতে ছাব্বিশ নক্ষত্র, হৃদয়ে সাধ্যগণ, প্রাণে মাতৃকূল এবং রূপে স্বয়ং দেবী কমলা বিচরণ করছেন। কেশজালে প্রদীপ্ত সূর্যরশ্মির ন্যায় দেবী বিমলা সংস্থিতা। শাস্ত্র মতে, এই সিংহ স্বয়ং হরি অর্থাৎ বিষ্ণুরই আর এক রূপ। দেবীর এই আসন মেরুশৃঙ্গের মতো শুভ্র ও অমলিন। যাঁর মধ্যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব সমবেত হয়েছেন, তিনি কেবল হিংস্র পশু হয়ে থাকেন না, হয়ে ওঠেন পরম পূজনীয় ‘শ্রীসিংহ’। তাই তো দুর্গোৎসবে দেবীর পাশাপাশি এই মহাজাগতিক সিংহের পুজোও বাধ্যতামূলক।
