www.machinnamasta.in

ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লী গং গণপতয়ে বর বরদ সর্বজনস্ময়ী বশমানয় ঠঃ ঠঃ

February 21, 2024 2:46 pm

মহাবিদ্যা বা দশমহাবিদ্যার দশটি রূপ হল দেবী পার্বতীর অবতার। দশমহাবিদ্যার একদিকে যেমন রয়েছেন এক অপরূপ সুন্দরী দেবীপ্রতিমা তেমনই অন্যদিকে রয়েছেন এক ভয়ংকর দেবীমূর্তি।দেবী সতীর এই দশ মহাবিদ্যার দশটি রূপ হল কালী, তারা, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলামুখী, ধূমাবতী, ত্রিপুরসুন্দরী বা ললিতা-ত্রিপুরসুন্দরী বা ষোড়শী, মাতঙ্গী, কমলাকামিনী এবং ভুবনেশ্বরী।দেবী ‘ধূমাবতী’ হলেন দশমহাবিদ্যার অন্যতমা এক তান্ত্রিক দেবী।

সপ্তম মহাবিদ্যা হলেন ধূমাবতী। মহাশক্তির একটি ভীষণা রূপ হলেন দেবী ধূমাবতী।বৃদ্ধা, কুত্‍সিত বিধবার বেশে সজ্জিতা, ধূমাবতী, হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী অমঙ্গলজনক বিষয়গুলি অর্থাত্‍ কাক ও চতুর্মাস ইত্যাদি বিষয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিতা।প্রচলিত মূর্তিকল্পে সাধারণত শ্মশানচারিণীরূপে কল্পনা করা হয় দেবী ধূমাবতীকে যিনি অশ্ববিহীন রথ বা কাকপৃষ্ঠে আরূঢ়া অবস্থায় আসীন।সৃষ্টির পূর্বে ও প্রলয়ের পরে বিদ্যমান “মহাশূন্যের” মূর্তিস্বরূপ প্রলয়ের প্রতীক হলেন দেবী ধূমাবতী।

অমঙ্গলকর বিষয়গুলির সঙ্গে ধূমাবতী সম্পর্কযুক্ত হলেও তাঁর সহস্রনাম স্তোত্রে দেবী ধূমাবতীর কয়েকটি সদগুণেরও বর্ণনাও রয়েছে। তিনি কোমলস্বভাবা ও বরদাত্রীও।শক্তিসংগম তন্ত্র গ্রন্থ অনুসারে, দক্ষরাজেরযজ্ঞকুন্ডে স্বামী মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞকুণ্ডে আত্মবলিদানের উদ্দেশ্যে আত্মাহুতি দেন দেবী সতী। সেই সময়ে সতীর দগ্ধ দেহের কালো ধোঁয়া থেকে উত্থিতা হন ধূমাবতী। আর তাই, শক্তিসংগম তন্ত্র গ্রন্থ অনুসারে, দেবী “সতীর দেহাবশেষ” এবং তাঁর অপমানিতা অবতার হলেন ধূমাবতী।

অন্যদিকে, প্রাণতোষিণী তন্ত্র গ্রন্থ অনুযায়ী, ধূমাবতীর বিধবা বেশের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা হল, একদা দেবী সতী মহাদেবের কাছে অন্ন প্রার্থনা করলে মহাদেব তাঁকে অন্ন দিতে অস্বীকার করেন। সেই সময় তাঁর প্রচণ্ড ক্ষুধার নিবৃত্তির জন্য মহাদেবকেই ভক্ষণ করেন দেবী সতী। মহাদেব যখন তাঁকে নিষ্কৃতি দিতে অনুরোধ করেন, তখন সতী মহাদেবকে পুনরায় উগরে দেন।এরপরই মহাদেব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দেবীকে বিধবার বেশ ধারণ করার অভিশাপ দেন।

অন্য আর একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, শুম্ভ ও নিশুম্ভ ওএস দুই অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেবী দুর্গা সৃষ্টি করেন দেবী ধূমাবতীকে। প্রাণঘাতী ধূমের সাহায্যে দৈত্যনাশ করেন ধূমাবতী।ধূমাবতী তন্ত্র গ্রন্থে দেবী ধূমাবতীকে বৃদ্ধা ও কুত্‍সিত বিধবার রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।দীর্ঘাকার, পাণ্ডুরবর্ণা, শীর্ণকায়া, রোগগ্রস্থা হওয়ার পাশাপাশি তিনি অশান্ত এবং তাঁর হৃদয় কুটিল।তাঁর দেহে কেন অলংকারাদি নেই। তিনি মুক্তকেশী এবং পুরনো মলিন বস্ত্র পরিধান করে থাকেন তিনি।

ভয়ংকর চক্ষুদুটির পাশাপাশি দেবী ধূমাবতীর নাসিকা দীর্ঘ ও বক্র। তীক্ষ্ণ দাঁতের কয়েকটি পড়ে যাওয়ার কারনে হাসলে তাঁকে ফোকলা মনে হয়।তাঁর কর্ণদ্বয় কুত্‍সিত ও অসম আকারবিশিষ্ট।তাঁর স্তন দুটি লম্বমান এবং এক হাতে তিনি একটি কুলো ধরে থাকেন এবং অন্য হাতে বরমুদ্রা বা চিন্মুদ্রা দেখান।দেবী ধূমাবতী অশ্ববিহীন রথে আরূঢ়া অবস্থায় আসীন এবং তাঁর পতাকায় থাকে কাকের ছবি। চতুরা ধূমাবতী সর্বদা ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকেন। কলহের কারণ এবং ভয় প্রদানকারিনী হলেন দেবী ধূমাবতী।প্রপঞ্চসারাসার সমগ্র অনুসারে, দেবী ধূমাবতী কৃষ্ণবর্ণা ও নাগ অলংকারে ভূষিতা।

শ্মশানক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত ছিন্ন বস্ত্রখণ্ডে নির্মিত হয় তাঁর বস্ত্র।তিনি দ্বিভূজা, শূল ও নরকপালধারিনী। অন্যদিকে, কোনও কোনও মূর্তিকল্পে শূলের জায়গায় তরবারিও থাকে দেবীর ধূমাবতীর হাতে। ভয়ংকরী ধূমাবতীর যোদ্ধার বেশ।শাক্তপ্রমোদ অনুযায়ী, ভয়ংকর শব্দ করে হাড় চিবিয়ে খান তিনি ধূমাবতী।এছাড়াও তিনি রণভেরী বাজিয়ে ভয়ংকর শব্দ করেন। তিনি নরকপালের মালা পরে থাকার পাশাপাশি চণ্ড ও মুণ্ডের হাড় চিবিয়ে ভক্ষণ করেন এবং মদের সঙ্গে রক্ত মিশিয়ে খান।

কোন কোন ক্ষেত্রে কাকবাহিনী ত্রিশূলধারিনী রূপে কল্পিত হন ধূমাবতী। মুণ্ডমালাধারিণী দেবী ধূমাবতীর তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রক্তবর্ণা, এবং তাঁর মাথার চুলা আলুলায়িত।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি মৃত্যুর দেবতা যমের মহিষশৃঙ্গ ধারণ করেন। এটি মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রতীক।পাশাপাশি, ধূমাবতীর রূপকল্পের কয়েকটি ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মোলারাম কর্তৃক অঙ্কিত ধূমাবতী কৃষ্ণবর্ণা। এই বর্ণনায় দেবী ধূমাবতী এখানে কুলো হাতে রথে চড়েছেন।

এবং দুটি কালো কাক তাঁর রথ টানছে। এই চিত্রে তিনি অলংকার পরিহিত অবস্থায় আছেন, যা তাঁর প্রচলিত রূপের ব্যতিক্রম।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ধূমাবতী কাকবাহিনীও।তবে, সর্বক্ষেত্রেই বিধবা রূপে কল্পিতা হন দেবী ধূমাবতী। তিনিই একমাত্র মহাবিদ্যা, যাঁর স্বামী নেই।ধূমাবতী নারীর সমাজবিরোধী ও অমঙ্গলময় সত্ত্বার প্রতীক। তিনি লক্ষ্মীর বিপরীত শক্তি। অলক্ষ্মীর মত বর্ষাকালের চার মাসে পূজিতা হন দেবা ধূমাবতী।লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় অশুভ জলশক্তি সূর্যালোককে আচ্ছন্ন করে রাখে এবং এই সময় বিষ্ণু নিদ্রায় যান। এই সময়টিকে অশুভ মনে করার কারনে বিবাহাদি থেকে শুরু করে কোন শুভ কাজ এই সময় হয় না।’ধূমাবতী’ নামটির অর্থ “ধূম্রময়ী”।

কথিত আছে, পোড়ালে ধোঁয়া হয় না, এমন কিছু জিনিস উত্‍সর্গ না করলে তিনি খুশি হন না। তিনি ধূপ ও চিতার ধোঁয়া পছন্দ করেন, যা ধ্বংসের প্রতীক। তিনি ধোঁয়ার আকারে বিহার করেন এবং যেখানে খুশি সেখানে যান।কোন কোন মতে, কালীর বৃদ্ধা রূপ হল দেবী ধূমাবতী।এই রূপ কালীর কালোত্তীর্ণা সত্ত্বা ও অরূপ জীবনীশক্তির প্রতীক।অন্য আর একটি মতে, দেবী ধূমাবতী হলেন শ্মশানকালীর অন্য একটি রূপ।কালীকুল ঐতিহ্যে মহাশক্তির এক ভয়ংকরী রূপ হিসেবে কল্পিত হন ধূমাবতী।ধূমাবতীর নাম স্তোত্রে তাঁকে পার্বতী ও সতীর অংশ বলা হয়েছে এবং তাঁকে দানবদলনী রূপে বন্দনা করা হয়েছে।

দেবী ধূমাবতীকে অমঙ্গলের দেবী মনে করে সাধারণ ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা হলেও, কোমলহৃদয়া এবং ভক্তের মনোবাঞ্ছাপূর্ণকারী বরদাত্রী রূপে বর্ণনাও করা হয়ে থাকে তাঁকে। অনেক স্থানেই দেবী ধূমাবতীকে বিপদ থেকে উদ্ধারকারিণী, সকল কামনা পূর্ণকারিণী, সিদ্ধি বা অলৌকিক ক্ষমতার প্রদানকারিণী এবং মোক্ষদাত্রীরূপেও বর্ণনা করা হয়ে থাকে।কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথি ধূমাবতীর পুজোর পক্ষে উপযুক্ত।

পুজোর দিন সারাদিন সারারাত উপবাস করে মৌনী থাকতে হয় পূজককে। রাত্রিকালে শ্মশানক্ষেত্রে ধূমাবতীর পুজো করা হয়।হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, সিদ্ধি বা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেন দেবী ধূমাবতী।সকল বিপদ থেকে উদ্ধার করার পাশাপাশি জ্ঞান ও মোক্ষফল সহ সকল অভীষ্ট বস্তু ভক্তকে প্রদান করেন ধূমাবতী।

শত্রুনাশের উদ্দেশ্যে তাঁর পুজো করা হয়ে থাকে। যদিও বিবাহিত ব্যক্তিদের ধূমাবতীর পুজো করতে বারণ করা হয়। সর্বত্যাগী ও পরিব্রাজক সন্ন্যাসীদের পক্ষে ধূমাবতীর পুজো সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত।ধূমাবতীর মন্দিরের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। ঝাড়খণ্ডের রাঁচি ও গুয়াহাটির কামাক্ষ্যা মন্দিরের কাছে ধূমাবতীর ছোটো মন্দির রয়েছে। এছাড়া, বারাণসীর একটি মন্দিরে ধূমাবতী হলেন প্রধান দেবতা। বারাণসীর এই মন্দিরটিকে শক্তিপীঠ বা সতীপীঠ বলেও দাবি করা হয়।

এই মন্দিরে রথারূঢ়া ও চতুর্ভূজা হলেন দেবী ধূমাবতী।চতুর্ভূজা দেবী ধূমাবতীর চার হাতে থাকে কুলো, ঝাঁটা, পাত্র ও অভয়মুদ্রা। ফল ও ফুল দিয়ে বারাণসীর এই মন্দিরে দেবীর পুজো করা হলেও মদ, ভাঙ, সিগারেট, মাংস, এমনকি রক্ত দিয়েও দেবী ধূমাবতীর পুজো করা হয়ে থাকে।সন্ন্যাসী ও তান্ত্রিকরা এই মন্দিরে ধূমাবতীর পুজো করেন। এই মন্দিরে দেবী গ্রামদেবতা বা স্থানীয়দের রক্ষাকর্ত্রীরূপেও পূজিতা হন।এছাড়া এখানে বিবাহিত যুগলেও পুজো উত্‍সর্গ করে থাকেন।

administrator

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *