www.machinnamasta.in

ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লী গং গণপতয়ে বর বরদ সর্বজনস্ময়ী বশমানয় ঠঃ ঠঃ

July 15, 2024 10:30 pm
bipadtarini

বাংলায় এই মাসে পালনীয় বড় পার্বণ হল বিপদতারিণী বা বিপত্তারিণী ব্রত। বারো মাসে তেরো পার্বণ বাঙালির ঘরে ঘরে। লোকাচার, মরশুমি অনুষ্ঠান মিলেমিশে একীভূত হয়ে যায়। বিপত্তারিণী ব্রত পালনের পর দিন বুধবার পালিত হবে উল্টোরথ যাত্রা৷ প্রচলিত বিশ্বাস, বিপত্তারিণী ব্রত পালন করলে সংসার থেকে বাধা বিঘ্ন ও অশান্তি দূর হয়।

‘বিপদতারিণী’ অর্থাৎ যিনি বিপদ থেকে তারণ করেন বা রক্ষা করেন। ‘বিপদতারিণী’ শব্দ অপভ্রংশে ‘বিপত্তারিণী’ হয়ে উঠেছে। বাংলা ও উড়িষ্যার আশপাশের গ্রামে-গঞ্জে বিপত্তারিণী পুজো বেশ জনপ্রিয়। চলছে আষাঢ় মাস। বাংলায় এই মাসে পালনীয় বড় পার্বণ হল বিপদতারিণী বা বিপত্তারিণী ব্রত। বারো মাসে তেরো পার্বণ বাঙালির ঘরে ঘরে। লোকাচার, মরশুমি অনুষ্ঠান মিলেমিশে একীভূত হয়ে যায়। আষাঢ়মাসের সোজা রথ থেকে উল্টোরথের মধ্যে মঙ্গলবার ও শনিবারে এই ব্রত ও পুজো পালন করা হয়ে থাকে সাধারণত তৃতীয়া থেকে নবমী তিথির মধ্যে৷

এ বছর বিপত্তারিণী (Bipadtarini Puja) পুজোর প্রথম তারিখ ও দিন হল ৯ জুলাই, মঙ্গলবার৷ বাংলা ক্যালেন্ডারে দিনটি হল ১৪৩১ সনের ২৪ আষাঢ়, মঙ্গলবার৷ বিপত্তারিণী ব্রতপালনের দ্বিতীয় দিনটি হল ১৩ জুলাই, শনিবার৷ বাংলা ক্যালেন্ডারে দিনটি হল ১৪৩১ সনের ২৮ আষাঢ়, শনিবার৷ বিপত্তারিণী দেবীর পুজোয় ১৩ সংখ্যাটি অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ৷ বাড়ির মেয়েরা মূলত এই ব্রত পালন করেন৷ বিপত্তারিণী ব্রত পালনের পর দিন বুধবার পালিত হবে উল্টোরথ যাত্রা৷ প্রচলিত বিশ্বাস, বিপত্তারিণী ব্রত পালন করলে সংসার থেকে বাধা বিঘ্ন ও অশান্তি দূর হয়। বিপদ কেটে আসে সুসময়।

ধ্যান ও প্রণামমন্ত্রওঁ

কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্। শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্। সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবনমখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্। ধ্যায়েদ্দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ।।

কেমন রূপ মা বিপত্তারিণীর (Maa Bipadtarini)

আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া অর্থাৎ রথযাত্রা এবং শুক্লা দশমী অর্থাৎ উল্টোরথ বা রথের পুনর্যাত্রা মাঝের শনিবার ও মঙ্গলবারে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। বিপত্তারিণী আসলে দেবী দুর্গা বা কালীরই এক রূপ। দুর্গার মতই তিনি সিংহবাহিনী। তবে কোথাও তিনি রক্তবর্ণা কোথাও আবার মা কালীর মতই কৃষ্ণবর্ণা। তাঁর চারটি হাতে খড়্গ, ত্রিশূল ও বরাভয় মুদ্রা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মা বিপত্তারিনী আসলে বাংলার এক লৌকিক দেবী। তবে মার্কণ্ডেয় মুনি প্রথম বিপত্তারিণী ব্রত কথা প্রচার করেন। 

হিন্দু ধর্মে বিপত্তারিণী ব্রতের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ভরে এই পুজো করলে যে কোনও বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এই বছর ০৯ জুলাই, মঙ্গলবার এবং ১৩ জুলাই, শনিবার পড়েছে বিপত্তারিণীর ব্রতর দিন।

পুজোর রীতি
মূলত মহিলারা রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রার মাঝের শনিবার ও মঙ্গলবারে উপবাসে থেকে দেবীর পুজো অর্চনায় অংশ নেন। মনষ্কামনা করে হাতে লাল সুতোর তাগা ধারণ করেন। সেই তাগায় তেরোটি দুর্বা সহ তেরোটি গিট দেওয়া থাকে।সেই সঙ্গে তেরো রকম ফল এবং তেরো রকম ফুল দিয়ে দেবীর পুজো করা হয়। অনেকে মনষ্কামনা পূর্ণ হলে দণ্ডী কাটেন। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় নদী বা কোন জলাশয়ে স্নান সেরে দণ্ডী কেটে পুজো স্থলে গিয়ে তাঁরা পুজো দেন।                

 কলকাতার কাছে রাজপুরে বিপত্তারিণী দেবীর মন্দির রয়েছে। কলকাতায় কালীঘাট সহ বিভিন্ন শক্তি মন্দিরে ওই দুদিন প্রবল ভক্ত সমাগম হয়।       

মনে রাখতে হবে – 

  • বিপত্তারিণী ব্রতের আগের দিন, ব্যক্তি শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার খেতে হয়।
  • ব্রতের দিনে  কোনও খাবার খাওয়া যায় না। পুজোর পর উপবাস ভাঙা হয়।  
  • সমস্ত রকমের বাধা, বিপত্তি ও বিপদ থেকে সন্তান এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য এই পুজো করা হয় । 
  • এই পুজোর দিন  চাল ও গমের কোনও খাবার না খাওয়াই ভাল ।

সব বিপদ হরণ করেন যিনি, তিনিই বিপত্তারিণী । তিনি মা কালীরই অন্য রূপ। এই পুজো আষাঢ় মাসে মঙ্গল ও শনিবার পালন করা হয়।  রথযাত্রার পরে এবং উল্টো রথের আগে মাঝের সময়ে করা হয় বিপত্তারিণী পুজো। এই বছর ২৪ জুন এবং ২৭ জুন এই ব্রতপালন। 

মা বিপত্তারিণীর ব্রতকথা (Bipadtarini Bratakatha)

মা বিপত্তারিণীর ব্রতকথায় দুই রাজপরিবারের কাহিনিকে ঘিরে। তখন বিদর্ভের রাজা সত্যদাস। তাঁর পুত্র অলোকেশ একবার মৃগয়া করতে করতে পথ ভুলে পাশের রাজ্য অবন্তীপুরের সীমানায় ঢুকে পড়েন। সে জায়গাটি ছিল অবন্তী রাজের মৃগয়া ক্ষেত্র। সেখানে একটি হরিণ শিকার করলে অবন্তী রাজ্যের সেনারা তাঁকে বেঁধে নিয়ে যায় রাজদরবারে। সেসময় অবন্তী রাজ্যের রাজা ছিলেন চক্রধর। তিনি সব ঘটনা শুনে অলোকেশকে বন্দী করার আদেশ দিলেন। 

 ‘রক্তচক্ষু মহারাজ হেরিয়া তাহারে
 আদেশিল রাখ গিয়া অন্ধ কারাগারে’

রাজপুত্রের বন্দী হওয়ার খবর বিদর্ভে পৌঁছলে বিদর্ভরাজ সত্যদাস ছুটে গেলেন অবন্তী রাজের দরবারে। কিন্তু অবন্তীরাজ তাঁকেও বন্দি করলেন। বিদর্ভ রাজ্যের রাজা এবং রাজপুত্রের বন্দি হওয়ার খবর পেয়ে বিদর্ভের রানী রত্না কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তখনই দৈববাণী হল-

 ‘বিপত্তারিণী দুর্গায় পুজহ বিশেষ।
 আমা প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা তোমার অশেষ।।’ 

চোখের জল মুছে রানী পুজোর আয়োজন করলেন। সেই দিনটা ছিল রথ যাত্রার পরের মঙ্গলবার। দেবী বিপত্তারিণীর পুজো সেরে রানী ভক্তিভরে দেবীর স্তব করতে লাগলেন।

 ‘বিপদনাশিনী মা জগৎ জননী।
 এঘোর সংকট হতে রক্ষা কর তুমি।।’

দেবীর চরণে লুটিয়ে পড়ে রাণী রত্না স্তব করতে লাগলেন। আর সংকল্প করলেন মায়ের কৃপা না হলে তিনি এই দেহ ত্যাগ করবেন। স্ত্রী এবং মায়ের এই কাতর প্রার্থনা শুনলেন দেবী। সেই রাতেই দেবী বিপত্তারিণী অবন্তীরাজ চক্রধরকে স্বপ্ন দিয়ে বললেন যে তুমি আমার ভক্তকে বন্দি করে রেখেছে দেখে আমি কষ্ট পাচ্ছি। এখনই তাদের মুক্তি দাও।

‘সে মোর প্রিয় জান নাকি তুমি।
 তারে বন্দি রাখিয়াছ দুঃখ পাই আমি।।’

এই স্বপ্ন পেয়ে অবন্তীরাজ তখনি বিদর্ভরাজ সত্যদাস এবং তাঁর পুত্র অলোকেশকে মুক্তি দিলেন। সেই সঙ্গে নিজের মেয়ের সঙ্গে অলোকেশের বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। এভাবেই দুই রাজ্য আত্মীয়তায় বাঁধা পড়ল। আর এভাবেই দেবীর প্রসাদ লাভ করে শান্তি ফিরল উভয় রাজ্যে। 

বিদর্ভের রাণী রত্নার এই ব্রত কথা স্মরণ করে আজও বাংলার ঘরে ঘরে মহিলারা সংসারের বিপদ কাটাতে ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে দেবী বিপত্তারিণীর পুজো করে থাকেন।

বিপদতারিণী পূজার মন্ত্র

মাসি পূণ্যতমে
বিপ্রমাধবে মাধবপ্রিয়ে
ন বম্যাং শুক্লপক্ষে চ
বাসরে মঙ্গল শুভে
সর্পঋক্ষে চ মধ্যাহ্নে
জানকী জনকালয়ে
আবির্ভূতা স্বয়ং দেবী
যোগেষু শোভনেষুচ
নমঃ সর্ব মঙ্গল্যে
শিবে সর্ব্বাথ্যসাধিকে
শরণ্যে ত্রম্বক্যে গৌরী
নারায়ণী নমস্তুতে

Wreath Mantra (পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র)

দূর্গান্ শিবান্ শান্তিকরিং ব্রক্ষাণি ব্রক্ষণ্যপ্রিয়াং
সব্বোলোকঃ প্রণিতিঞ্চ প্রণমামি
সদাশিবান্ মঙ্গলাং শোভনাং
শুদ্ধাং নিস্কলাং পরমাস্কলাং বিশ্বেশ্বরীং
বিশ্বমাতাং চন্ডীকাং প্রণমাম্যহম
এই পুষ্পাঞ্জলি গৃহাণ পরমেশ্বরী
বিপদতারিণী চন্ডীকায়ৈঃ নমঃ

Bipadatarini Prostration Mantra (বিপদতারিনী প্রণাম মন্ত্র)

সর্বমঙ্গল মাঙ্গল্যে শিখে সর্বার্থ সাধিকে
শরণ্যে ত্রম্ব্যকে গৌরি নারায়ণী নমস্তুতে
সৃষ্টি স্থিতি বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনী
গুনাশ্রয়ে গুনময়ে নারায়নি নমোহস্তুতে
শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়নে
সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমোহস্তুতে

মা বিপত্তারিণী পুজো:~

মা বিপত্তারিণী পুজো আষাঢ় মাসের রথযাত্রা থেকে উল্টোরথের মধ্যে যে শনিবার বা মঙ্গলবার পড়ে, সেই দিনগুলিতে বিপত্তারিণী ব্রত করা হয়। স্ত্রীলোকেরা মনে মনে যা চেয়ে এই ব্রত করেন, তাঁদের সেই মনস্কামনা সফল হয়। মা দুর্গার আর এক রূপ মা বিপত্তারিণী। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া থেকে নবমী তিথি অর্থাৎ রথযাত্রা থেকে উল্টোরথের মধ্যে যে কোনও মঙ্গলবার বা শনিবার এই পুজো করা হয়। সংসারের সকল বিপদ এর থেকে মুক্তির আশায় এই পুজো করা হয়।

এই ব্রত পালন করলে সংসারের সব বিপদ কেটে যায়। আসুন জেনে নেওয়া যাক ঠিক কোন কোন উপকরণের প্রয়োজন হয় বিপত্তারিণী পুজোয় –

1) ঘট স্থাপন করতে হয়, 2) ঘটের উপর দিতে হয় আমের পল্লব, 3) তার উপর স্থাপন করতে হয় শীষ সমেত ডাব, 4) একটি নৈবেদ্য দিতে হয়, 5) মায়ের চরণে নিবেদন করতে হয় 13 রকম ফুল, 6) দু’ভাগে কাটা 13 রকম ফল, 7) আলাদা চুবড়িতে 13 টা গোটা ফল, 13 গাছি লাল সুতো, 9) 13 টি দূর্বা, পান ও সুপুরি দিতে হয়।

সঠিক নিয়ম মেনে শ্রেষ্ঠ উপাচারে যদি এই ব্রত পালন করা হয়, তা হলে খুব ভাল ফল পাওয়া যায়। এই পুজোয় দূর্বা ঘাসের সঙ্গে লাল সুতো বেঁধে হাতে পরার নিয়ম অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মেয়েরা বাম হাতে এবং ছেলেরা ডান হাতে এই সুতো বাঁধেন। মনে করা হয় এই সুতো হাতে বাঁধলে মায়ের কৃপায় সব বিপদের হাত থেকেই রক্ষা পাওয়া যায়।

এই পুজোয় ফুল, ফল সব কিছুই ১৩টি করে অর্পণ করার নিয়ম রয়েছে। লাল সুতোয় ১৩টি গিঁট ও ১৩টি দূর্বা বাঁধার নিয়ম রয়েছে। পুজোর শেষে এই সুতো হাতে পরতে হয়। তবে অবশ্যই পুজোর শেষে মায়ের ব্রতকথা শুনতে হবে। এতে বেশি ভাল ফল লাভ করা যায়। বিপত্তারিণী ব্রত করার আগের দিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করা উচিত।

কথায় বলে বিপদ তো বলে আসে না, বিপদ এলেই মনে আসে প্রবল দুশ্চিন্তা। তখন মনে হয়, ঠিক কী করলে এই বিপদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তাই মনে ভক্তি ও বিশ্বাস রেখে এই মন্ত্র যদি মা বিপত্তারিণীর পুজো করা যা তা হলে সকল বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং মনের সকল বাসনাও পূরণ হয়।

মন্ত্র

মাসি পূন্যতমেবিপ্র মাধবে মাধবপ্রিয়ে। ন বম্যাং শুক্লপক্ষে চ বাসরে মঙ্গল শুভে। সর্পঝক্ষে চ মধ্যাহ্নে জানকী জনকালয়ে। আবির্ভূতা স্বয়ং দেবীযগেষু শোভনেষুচ। নমঃ সর্ব মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমস্তুতে।।

administrator

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *