www.machinnamasta.in

ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লী গং গণপতয়ে বর বরদ সর্বজনস্ময়ী বশমানয় ঠঃ ঠঃ

April 15, 2024 11:51 pm
মা মনসা (Ma Manasa)

"মনসা" শব্দটি বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘মনে চিন্তন’। আমাদের মনের মধ্যে বিষ থাকতে পারে, সেই বিষ অবশ্যই মনকে বিষাক্ত করে এবং চিন্তার খোরাক যোগায়। মনকে বিষ মুক্ত অর্থাৎ চিন্তা মুক্ত করতেই মনসা পুজা! মনসা মন্ত্র মনকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারে।মন যদি কোনো কারনে বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয় তবে সমগ্র দেহই বিষাক্ত হয়ে যাবে। আর এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য ঋষিগন মনসা দেবীকে বিষহরী দেবী রুপে দেখিয়েছেন।

মা মনসার ধ্যান মন্ত্র অনুসারে ——(Ma Manasa Dhyan Mantra)

.

ওঁ দেবীমম্বামহীনাং শশধরবদনাং চারুকান্তিং বদন্যাম্ ।

হংসারূঢ়মুদারামস সুললিতবসনাং সর্বদাং সর্বদৈব ।।

স্মেরাস্যাং মণ্ডিতাঙ্গীং কনকমণিগণৈর্মুক্ তয়া চ ।

প্রবালৈর্বন্দেহ হং সাষ্টনাগামুরুকু চগলাং ভোগিনীং কামরূপাম্ ।।

.

এর অর্থ- সর্প দিগের মাতা, চন্দ্র বদনা, সুন্দর কান্তি বিশিষ্টা, বদন্যা, হংস বাহিনী, উদার স্বভাবা , লোহিত বসনা , সর্বদা সর্ব অভিষ্ট প্রদায়িনী, সহাস্য বদনা, কণক মনি মুক্তা প্রবালাদির অলঙ্কার ধারিনী, অষ্ট নাগ পরিবৃতা, উন্নত কুচ যুগল সম্পন্না, সর্পিণী, ইচ্ছা মাত্র রূপ ধারিনী দেবীকে বন্দনা করি।

 

প্রণাম মন্ত্রঃ——–(Ma Manasa pronam Mantra)

ওঁ অযোনিসম্ভবে মাতর্মহেশ্বরসুতে শুভে ।

পদ্মালয়ে নমস্তুভ্যং রক্ষ মাং বৃজিনার্ণবাত্ ।

আস্তিকস্য মুনের্মাতা ভগিনী বাসুকেস্তথা ।

জরত্কারুমুনেঃ পত্নী মনসাদেবী নমোহস্তু তে ॥

 

“মনসা” শব্দটি বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘মনে চিন্তন’। আমাদের মনের মধ্যে বিষ থাকতে পারে, সেই বিষ অবশ্যই মনকে বিষাক্ত করে এবং চিন্তার খোরাক যোগায়। মনকে বিষ মুক্ত অর্থাৎ চিন্তা মুক্ত করতেই মনসা পুজা! মনসা মন্ত্র মনকে ঊর্ধ্বগামী করতে পারে।মন যদি কোনো কারনে বিষক্রিয়ায় জর্জরিত হয় তবে সমগ্র দেহই বিষাক্ত হয়ে যাবে। আর এই অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য ঋষিগন মনসা দেবীকে বিষহরী দেবী রুপে দেখিয়েছেন।

 

মনসা অঞ্জলি:———

১)আস্তিকস্য মুনের মাত জগৎ আনন্দকারিনী। এহ্যেহি মনসাদেবী নাগমাতা নমোহস্তুতে।

———–এসো স্ব চন্দন বিল্বপত্র পুস্পাঞ্জলি ওঁ শ্রী মনসা দেবিভ্যই নমঃ।।

২)আগচ্ছে বরদা দেবী সর্ব কল্যাণ কারিনী। সর্পভয় বিনাশিনী মনসা দেবী নমোহস্তুতে।

———–এসো স্ব চন্দন বিল্বপত্র পুস্পাঞ্জলি ওঁ শ্রী মনসা দেবিভ্যই নমঃ।।

৩)আস্তিকস্য মুনির মাতা ভগিনী বাসুকেস্তথা। জরৎকারু মুনে পত্নী মনসাদেবী নমোহস্তুতে।

———–এসো স্ব চন্দন বিল্বপত্র পুস্পাঞ্জলি ওঁ শ্রী মনসা দেবিভ্যই নমঃ।।

 

মনসা নামের উৎপত্তি—-

= = = = = = = = = =

‘মনস’ শব্দের স্ত্রী লিঙ্গে ‘আপ’ প্রত্যয় করে মনসা শব্দের ব্যুৎপত্তি। সুতরাং এই দিক থেকে মনসা মনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দেবী ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ বলেন – সর্প ভয় থেকে মনুষ্যদের উদ্ধারের জন্য পরম পিতা ব্রহ্মা কশ্যপ মুনিকে বিশেষ মন্ত্র বিশেষ বা বিদ্যা আবিস্কারের কথা বলেন। হয়তো এখানে বিষের ঔষধ আবিস্কারের কথা সেই সাথেও বলা হয়। কশ্যপ মুনি এই বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করছিলেন। তখন তাঁর মন থেকে এক দেবীর সৃষ্টি হয়। তিনটি কারনে দেবীর নাম হয় মনসা।

 

‘সা চ কন্যা ভগবতী কশ্যপস্য চ মানসী ।

তেনৈব মনসা দেবী মনসা বা চ দীব্যতি ।।

মনসা ধ্যায়তে যা চ পরমাত্মানমীশ্বর ম্ ।

তেন যা মনসা দেবী তেন যোগেন দীব্যতি ।।

আত্মারামা চ সা দেবী বৈষ্ণবী সিদ্ধযোগিনী ।’ —- ( দেবীভাগবত পুরাণ )

প্রথমতঃ মনসা কশ্যপ মুনির মানস কন্যা, কেননা চিন্তা ভাবনার সময় মুনির মন থেকে উৎপন্না। দ্বিতীয় মানুষের মন তদীয় ক্রীড়া ক্ষেত্র, তৃতীয়তঃ নিজেও মনে মনে পরমাত্মার ধ্যান করেন বলে দেবীর নাম মনসা। মন মানুষের শত্রু আবার মন মানুষের মিত্র হতে পারে। “মন এব মনুষ্যানাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ।” মন যদি শুদ্ধ, একাগ্র চিত্ত, নিজ বশীভূত, ভগবৎপরায়ণ হয় – ত সেই মন মোক্ষের কারন। তাই এই মনকে ‘মিত্র’ বলা যাবে। কিন্তু মন যদি অশুদ্ধ, চঞ্চল, ইন্দ্রিয় পরায়ণ, ভগবৎ বিমুখ হয়- ত সেই মন নরক গমনের হেতু। এই মন হল শত্রু মন। কশ্যপ মুনি মানব কল্যাণের জন্য ঔষধ আবিস্কারের কথা ভেবেছিলেন – তাই তাঁর মন থেকে দেবীর সৃষ্টি হল। তাই শাস্ত্রের এই শিক্ষা যে, আমাদের সর্বদা কল্যাণকর, হিতকর, ভগবানের কথা —-ইত্যাদি মনে ভাবনা চিন্তা করতে হবে।

 

সাপের দাঁতে বিষ আছে কিন্তু নিজে যখন খায়, তাতে কোনো বিষ লাগে না। কিন্তু হিংসায় কিংবা আত্মরক্ষার্থে যখন দংশন করে তখন দংশিত স্থানে বিষ ছড়ায়। তাই মনে বিষ হলে হিংসা, ক্রোধ, লোভ এসব দূরীকরনের নিমিত্তে মনসা পূজা করা হয়। অন্যভাবে বললে, আমরা নিজেরা অনেক সময় চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে পারি না। তবে চিন্তা যাতে নিজের কিংবা অন্যের খারাপের কারন না হয়, সেই শিক্ষাই দিয়েছে দেবী মনসা।

 

ইনি সর্পদেবী।প্রধানত বাংলা অঞ্চল(বঙ্গদেশ) এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারতে এই দেবীর পূজোর প্রচলন বেশী দেখা যায়।সর্পভয় নিবারণ ও সাপের হাত থেকে রক্ষা পেতে, প্রজনন ও ঐশ্বর্য লাভের কামনায় মনসা দেবীর পূজা করা হয়ে থাকে।

মনসা হলেন নাগরাজ বাসুকীর ভগিনী(বোন)ও ঋষি_জরুৎকারু-এর স্ত্রী।তার অপর নাম বিষহরি/বিষহরা(বিষ ধ্বংসকারিনী),নিত্যা(চিরন্তনী) ও পদ্মাবতী।দেবীর বাহন হলেন সাপ ও রাজহংস।

 

পুরান ও কিংবদন্তী অনুসারে পিতা শিব ও স্বামী জরুৎকারু মনসাকে প্রত্যাখ্যান করেন।কোন কোন ধর্মগ্রন্থ মতে ঋষি_কশ্যপ হলেন মনসার পিতা।ঋষি কশ্যপের মনের থেকে জন্ম হয় মনসার।মনের থেকে জন্ম বলেই,এনার নাম মনসা।তাই তিনি কাশ্যপ_গোত্রজ।পুরান মতে ঋষি কশ্যপ ও নাগজননী কদ্রু-এর কন্যা দেবী মনসা।সর্পদেবী হিসেবে মনসার নাম সর্বপ্রথম অথর্ববেদ-এ উল্লেখ পাওয়া যায়।

মহাভারত অনুযায়ী ঋষি জরুৎকারু চিরকুমার থাকার জন্য বিবাহ করবেননা ঠিক করেন।কিন্ত একদিন গভীর অরণ্যে পথ চলতে গিয়ে লক্ষ্য করেন, কয়েকজন মানুষ উপরে পা,আর নীচে মাথা দিয়ে গাছের ডালে ঝুলে আছেন।জরুৎকারু দেখে চিনতে পারলেন,তারা হলেন তার পূর্বপুরুষগন।

 

পারলৌকিক(শ্রাদ্ধকর্ম) ক্রিয়া না হওয়ার ফলে তাদের মুক্তি হয়নি।তাই তাদের এইরূপ অবস্থা।পূর্বপুরুষগন তখন ঋষি জরুৎকারুকে বিবাহ করে,সন্তান উৎপাদন করতে বলেন,যাতে সেই সন্তান তাদের পারলৌকিক কর্ম করে তাদের মুক্তি দেন।পূর্বপুরুষগনের কথা মতো ঋষি জরুৎকারু নাগরাজ বাসুকির ভগিনী মনসার সাথে বিবাহ সুত্রে আবদ্ধ হন।পরবর্তিতে তাদের এক সন্তানের জন্ম হয়।সেই সন্তানের নাম হল আস্তিক।

পুরান অনুযায়ী পিতা ঋষি কশ্যপ, তার কন্যা মনসার সাথে ঋষি জরুৎকারুর বিবাহ সম্পন্ন করান।কিন্ত ঋষি জরুৎকারু একটা শর্তে মনসাকে বিবাহ করেন।শর্ত হল,মনসা যদি তার স্বামী ঋষি জরুৎকারুর কথার অবাধ্য হন,তবে ঋষি জরুৎকারু সেই মুহূর্তেই মনসাকে প্রত্যাখ্যান করবেন।পরবর্তীতে তাদের সন্তান আস্তিকের জন্ম হয়।

একদিন ঋষি জরুৎকারু মনসাকে নির্দেশ করলেন যে,তিনি নিদ্রায়(ঘুমোতে) যাবেন,তাকে যেন মনসা তার পূজোর সময় জাগ্রত করে দেন,কিন্ত দেবী মনসা তার সর্প সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরায়, জরুৎকারুকে ঘুম থেকে ডাকতে ভুলে যান।জরুৎকারু ঘুম ভেঙে দেখেন যে,তার পূজোর সময় অনেকক্ষন পার হয়ে গেছে।ক্রোধাসক্ত হয়ে ঋষি জরুৎকারু মনসাকে প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও কিছুকাল পরে, দেবতাদের আর্জিতে ঋষি জরুৎকারু পুনরায় মনসাকে গ্রহন করেন।

সর্পকুলকে পৃথিবীর বুক থেকে ধ্বংস করতে,যজ্ঞ করেছিলেন রাজা জনমজেয়।কিন্ত মনসা-পুত্র আস্তিক তখন সর্পকুলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

 

মনসা পূজাঃ——-

আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার পর যে পঞ্চমী তিথি (শ্রাবণ) তাকে নাগপঞ্চমী বলে। নাগপঞ্চমীতে উঠানে সিজগাছ স্থাপন করে মনসা পূজা করা হয়। ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা পঞ্চমী পর্যন্ত পূজা করার বিধান আছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একমাস যাবত্‍ পূজা করে পূজাসমাপনান্তে বিশেষভাবে পুজো করা হয় অথবা শুধুমাত্র শেষ দিনে পুরোহিত দ্বারা পূজা করা হয়। উল্লেখ্য, নাগকুল কশ্যপমুনির জাত যা সাধারণ সাপ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন যেমন- অনন্ত, শিষ, বাসুকি প্রভৃতি উদাহরণস্বরূপ বিষ্ণুর মস্তকের উপরে থাকে শিষ নাগ।

 

বাংলা সাহিত্যে মনসাঃ——–

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে কানা হরি দত্ত রচিত মনসা মঙ্গল, নারায়নদেবের পদ্মপুরাণ, বিপ্রদাস বিপলাই রচিত মনসা বিজয়, কেতাকদাস, ক্ষেমানন্দ প্রমুখসহ পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) প্রায় বাইশ জন কবি রচিত মনসাকে নিয়ে মঙ্গলকাব্য ও পালাগান তত্‍কালীন বাংলার আর্থ -সামাজিক প্রতিচ্ছবিকে প্রকাশ করে।

 

পৌরানিক কাহিনী ও মঙ্গলকাব্যঃ———-

মনসা মূলত একজন আদিবাসী দেবতা। নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন, বরং তিনি একজন হিন্দু দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। হিন্দু দেবী হিসেবে তাঁকে নাগ বা সর্পজাতির পিতা কশ্যপ ও মাতা কদ্রুর সন্তান রূপে কল্পনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ, মনসাকে শিবের কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সময় থেকেই প্রজনন ও বিবাহরীতির দেবী হিসেবেও মনসা স্বীকৃতি লাভ করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, শিব বিষপান করলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন; সেই থেকে তিনি বিষহরি নামে পরিচিতা হন। তাঁর জনপ্রিয়তা দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত প্রসারিত হয়। মনসার পূজকেরা শৈবধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও অবতীর্ণ হন। শিবের কন্যারূপে মনসার জন্মকাহিনি এরই ফলস্রুতি। এর পরেই হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। শিব তাঁকে কৃষ্ণ-আরাধনার উপদেশ দেন। মনসা কৃষ্ণের আরাধনা করলে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে তাঁকে সিদ্ধি প্রদান করেন এবং প্রথামতে তাঁর পূজা করে মর্ত্যলোকে তাঁর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা করার উপদেশ দেন।

 

ভগবানের পরামর্শে মনসা মর্ত্যে নেমে আসেন মানব ভক্ত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। প্রথম দিকে মানুষ তাঁকে উপহাস করত। কিন্তু যারা মনসার ক্ষমতা অস্বীকার করল, তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলে মনসা তাদের বাধ্য করলেন তাঁর পূজা করতে। মুসলমান শাসক হাসানের মতো বিভিন্ন জাতির মানুষকে মনসা তাঁর ভক্ত করে তুললেন। কিন্তু চাঁদ সদাগর তাঁর পূজা করলেন না। মনসা লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মতো একজন দেবী হতে চাইছিলেন। তাতে সফল হওয়ার জন্য চাঁদ সদাগরের হাতে পূজাগ্রহণ তাঁর কাছে বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু চাঁদ সঙ্কল্প করেছিলেন, তিনি মনসার পূজা করবেন না।

 

মনসা চাঁদকে ভয় দেখানোর জন্য একে একে চাঁদের ছয় পুত্রকে হত্যা করলেন। শেষে মনসা ইন্দ্রের রাজসভার দুই নর্তক-নর্তকীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলেন। এঁদের নাম ছিল অনিরুদ্ধ ও ঊষা। অনিরুদ্ধ চাঁদ ও তাঁর স্ত্রী সনকার সপ্তম পুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করলেন। তাঁর নাম হল লখিন্দর। ঊষা বেহুলা নামে জন্মগ্রহণ করলেন। লখিন্দর ও বেহুলার বিবাহ হল। মনসা লখিন্দরকে হত্যা করলেন। কিন্তু বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ নিয়ে নদীতে ভেসে চললেন। শেষে তিনি চাঁদের সাত পুত্রের প্রাণ ও হারানো সম্পদ পুনরুদ্ধার করার উপায় জেনে ফিরে এলেন। চাঁদ মনসার দিকে না তাকিয়েই বাঁ হাতে তাঁর দিকে ফুল ছুঁড়ে দিলেন। মনসা এতেই খুশি হলেন। তিনি চাঁদের পুত্রদের জীবন ফিরিয়ে দিলেন এবং তাঁর হারানো সম্পদও ফিরিয়ে দিলেন। মঙ্গলকাব্যে রয়েছে, এরপর মনসার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেল।

 

মনসামঙ্গল কাব্য গ্রন্থে রয়েছে, পূর্বজন্মে মনসা চাঁদকে বিনা কারণে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তাই চাঁদও মনসাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি মনসার পূজা না করলে, মনসাপূজা মর্ত্যে জনপ্রিয়তা পাবে না। এই কারণেই, ভক্তদের আকর্ষণ করতে মনসার অসুবিধা হচ্ছিল।

 

এরপর মনসা বা পদ্মা ‘শক্তি’র একটি রূপ হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং শৈবরা তাঁর পূজা স্বীকার করে নেন। তিনি ঈশ্বরের মাতৃকাশক্তির এমন একটি ধারা, যাঁকে অনেক ভক্ত দূরবর্তী ও নির্গুণ শিব ধারণার থেকে নিকটতর ও প্রিয়তর মনে করেন।

 

পরিশেষঃ———

ভগবান গীতায় ১০ম অধ্যায়ের ২৮-২৯ শ্লোকে বলেছেন, সর্পের মধ্যে বাসুকি, নাগের মধ্যে তিনি অনন্ত। আবার তিনি খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, আকাশ যেমন সবকিছুকে আচ্ছাদিত করে থাকলেও কোন কিছুর সাথে লেগে নেই তেমনি সবকিছুর শক্তি তাঁর ই অথচ তিনি কোনকিছুর সাথে জড়িত নন দেবী মনসার পুজো কালক্রমে বাঙালি সনাতনী সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেরালা, তামিলনাড়ুসহ দক্ষিণভারতে, নেপালের কাঠমুন্ডুতে আজ নাগপঞ্চমী অন্যতম প্রধান উৎসব। বাংলাদেশে দিনাজপুর, বরিশাল সহ অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের পল্লীতেও গড়ে উঠেছে অনেক মনসা দেবীর মন্দির। এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন দর্শনেও দেওয়া হয়েছে মনসা দেবীকে বিশেষ মর্যাদা।

দেবী মনসার প্রতি হাজারো ভক্তের বিনয়াবনত: শ্রদ্ধা জানিয়ে, শঙ্খ-উলুধ্বনি দিয়ে, মঙ্গল প্রদীপ আর ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশালের আগৈলঝাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে মধ্যযুগের মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থ রচয়িতা, বাংলা সাহিত্যের অমর কবি বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দিরের ৫২২ বছরের পুরোনো বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পূজা উপলক্ষে ইতোমধ্যে সাধু-সন্যাসী, দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্ত এবং স্থানীয় বিভিন্ন উপজেলার হাজারো নারী-পুরুষ পূজারী ও ভক্তদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে উঠেছিল মন্দির আঙ্গিনা। মন্দিরের পার্শ¦বর্তী এলাকায় পূজা উপলক্ষে বসেছে গ্রামীণ মেলা। বাৎসরিক এই পূজা উপলক্ষে মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থকে উপজীব্য করে তিনদিন ব্যাপী রয়ানী পালাগান শেষ হয়েছে গত ১৪ আগস্ট।

মনসা মঙ্গল কাব্যে বর্ণিত কাহিনী চয়ন করে রয়ানী শিল্পীরা নৃত্যগীতের মধ্যদিয়ে মনসা মঙ্গল কাব্যের রস ফুটিয়ে তোলেন তাদের গানে। যুগ যুগান্তর থেকে রয়ানি গানের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ মনসার পূজার মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টায় পূজা করে আসছে। বাৎসরিক পূজা শেষে সকালে পূজা অর্চনা শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে চলে ভোগরাগ, বলিদান ও ভোগের প্রসাদ বিতরণ।

 

প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা গ্রামে ইংরেজী ১৪৫০ সালে বিজয় গুপ্ত জন্মগ্রহন করেন। তার বাবার নাম সনাতন গুপ্ত ও মায়ের নাম রুক্কিনী দেবী। বিজয় গুপ্ত ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ৪৪ বছর বয়সে তিনি বিষহরি দেবী মনসা কর্তৃক স্বপ্নে আদিস্ট হয়ে ফুল্লশ্রী গ্রামের মনসাকুন্ড নামে খ্যাত বর্তমান মন্দিরের পার্শ্ববর্তী দীঘি থেকে স্বপ্নে প্রাপ্ত ঘট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এরপর কবি বিজয় গুপ্ত দেবী পদ্মা বা দেবী মনসা কর্তৃক পুনরায় স্বপ্নে আদিস্ট হয়ে দীঘির পার্শ্ববর্তী বকুল গাছের নীচে বসে নবাব হোসেন শাহ’র শাসনামলে (১৪৯৪ সালে) পদ্মপুরাণ বা মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের অমর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। মনসা মঙ্গল কাব্যগ্রন্থ রচনা করায় কবি বিজয় গুপ্ত সুলতানের দরবারে ‘মহাকবি’ উপাধি লাভ করেন।

বিজয় গুপ্ত বিভিন্ন এলাকায় কিছুকাল সদলবলে মনসা মঙ্গল গানও করেন। এরপর তিনি তীর্থ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কাশীধাম গমণ করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকসেনারা বিজয় গুপ্ত প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দিরের অভ্যন্তরে ব্যাপক লুটতরাজ ও ধ্বংস যজ্ঞ চালায়। লুটতরাজ শেষে শুধুমাত্র রেখে যায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠিত ঘটটি।

স্বাধীনতার পর থেকে ওই ঘটেই চলে আসছিল নিত্যদিনের পূজা অর্চনা। দেবী মনসার মন্দিরের বাৎসরিক পূজা উপলক্ষে সকাল ৭টায়, দুপুর ১টায় ও বিকেল ৪টায় তিন দফায় পূজা অর্চনা, ভোগরাগ, ছাগ বলিদান ও ভোগের প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের বিভিন্ন মন্দিরে ও বাড়িতে মনসা দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

administrator

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *