চারপাশ ফাঁকা নির্জন। অজয়ের হাওয়ায় গরমের ক্লান্তি ততক্ষণে অনেকখানিই দূর হয়ে গিয়েছে। অজয়ের সেই মিষ্টি হাওয়া শরীর-মন ছুয়ে যেতে একতারায় টুংটাং শুরু করলেন রাখাল বাউল। গান শেষ করে একতারাটাও নামিয়ে রাখলেন। ফাঁকতালে তাকে জানানো হল খবরটা ‘এই একতারা জিআই তকমা পেয়েছে, শুনেছেন?’ খবরটা হঠাৎ শুনে একদৃষ্টে মুখের দিকে চেয়ে রয়েছেন রাখাল বাউল। সঙ্গে মুখে একটা সুন্দর মিটিমিটি হাসি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একসময় এই বাউল ভাবধারায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেইসময় জমিদারি দেখাশোনার কাজে শিলাইদহে থাকাকালীন বাউল সাধকদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। বাউলসঙ্গ ও লালন-ফকিরের গান কবিগুরুকে যে জীবনবোধে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে উপনিষদের বাণী আর বাউলের গান একাকার হয়ে ওঠে। বয়সকালে শিলাইদহ-পদ্মা-বাউল-ফকিরদের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ ক্রমে দূরে সরে গিয়েছিলেন বটে, তবুও একতারার উপস্থিতি তিনি সর্বত্র অনুভব করেছেন।
ইতিহাসবিদ তথা অধ্যাপক অমিয় ঘোষ বলেন, ‘বাংলায় বাউল-ফকিরি গানের জন্ম মূলত পঞ্চদশ এবং অষ্টাদশ শতকের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে থেকে। ঠিক যে সময়ে ভক্তি আন্দোলন এবং সুফিদর্শনের মেলবন্ধন ঘটে, পঞ্চদশ শতকের সাহিত্যেও যার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরে লালন ফকিরের হাত ধরে এই ভাবধারার বিকাশ ঘটে।’ অধ্যাপকের অনুমান, সেই সময়েই একতারার বিবর্তিত রূপের দেখা মেলে বাংলায়।
তবে ঠিক কবে থেকে আর কেমন ভাবে এই বাদ্যযন্ত্র বানানো শুরু হয়? এই বিষয়ে স্মৃতি হাতড়ে প্রবীণ অধ্যাপক জানান, বাউল ভাবধারার জন্মের সময়ে লোহা ততটাও সহজলভ্য ছিল না। তাই সেই সময়ে গাছের ছাল বা চামড়ার নরম অংশ শুকিয়েই তার (স্ট্রিং) তৈরি হতো। পরে অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতকে লোহা আসে। তবে সিন্থেটিক দড়ি দিয়েও এই তার তৈরি হয়। অমিয় বলেন, ‘এই বাদ্যযন্ত্র যেহেতু বহন করতে হয়, তাই হালকা হওয়া বিশেষ জরুরি। তা নজরে রেখে অনেক সময়ে লাউয়ের মতো দেখতে একধরনের তেঁতো ফল শুকিয়েও এই তার তৈরি করা হয়।’
