পানিহাটি ও খড়দা – দুটি প্রাচীন ধৰ্মীয় জনপদ। গঙ্গার ধারে গড়ে উঠেছে বহু প্রাচীন সব মঠ মন্দির। উপচে পড়া ভিড়। খোল-করতালের ধ্বনিতে মুখরিত চারপাশ। আগামী ২৭ জুন উত্তর ২৪ পরগণার পানিহাটিতে বসতে চলেছে চিঁড়া-দধি মহোৎসবের পুণ্য আসর। পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন এই উৎসব আসলে বাংলার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য দলিল। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ও শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামীর ঐতিহাসিক মিলন, যা ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’-এ অমর হয়ে আছে। এই উৎসবের নেপথ্যে কোন ইতিবৃত্ত? ষোড়শ শতকের এক অদ্ভুত অধ্যায়। সপ্তগ্রামের ধনাঢ্য জমিদার পুত্র রঘুনাথ দাস। অগাধ ঐশ্বর্য ত্যাগ করে তাঁর মন তখন ব্যাকুল শ্রীচৈতন্যের সান্নিধ্য পেতে। আশীর্বাদের আশায় তিনি পানিহাটিতে এলেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর চরণে। নিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে দেখে এক মধুর ‘দণ্ড’ দিলেন। আদেশ করলেন, সমবেত ভক্তদের চিঁড়া আর দই খাওয়াতে হবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটি শাস্তি মনে হলেও, আসলে তা ছিল এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক কৃপা।
বিনম্র চিত্তে রঘুনাথ দাস সেই আদেশ শিরোধার্য করলেন। গঙ্গার তীরে আয়োজন হল মহোৎসবের। চিঁড়া, দই, দুধ, কলা আর আম দিয়ে তৈরি হল সুস্বাদু মহাপ্রসাদ। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্তের আকুল টানে স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে অলৌকিকভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই উৎসব কেবল ভোজনের উৎসব নয়, এর অন্তরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক সাম্যের বার্তা। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে, জাতপাতের গণ্ডি পেরিয়ে হাজার হাজার মানুষ সেদিন একসঙ্গে বসে প্রসাদ পেয়েছিলেন। আধুনিক যুগের সমাজতত্ত্ব যে ‘সাম্য’ ও ‘সৌহার্দ্যের’ কথা বলে, পানিহাটির মেলা বহু শতাব্দী আগেই তার পথ দেখিয়েছিল। চিঁড়া ও দই অত্যন্ত সাধারণ খাদ্য। এই সাধারণ উপাদানের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় যে, ঈশ্বরের কাছে আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের ভক্তি অনেক বেশি মূল্যবান।
