দেবীপুরাণে দুর্গাপুজোকে ‘অশ্বমেধ’ যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। উৎসবের আড়ালে রয়েছে বিশ্বকে রক্ষার আকুতি। আর সেই আকুতি পালনে রয়েছে নানাবিধ আচার, রীতিনীতি। আলোর উদযাপনের আড়ালেই রয়েছে অন্ধকারকে পরাজিত করার প্রাচীন তন্ত্রসাধনা। দুর্গাপুজো মানে কেবল পুষ্পাঞ্জলি বা নতুন জামার আনন্দ নয়। নেপথ্যে রয়েছে বহু প্রাচীন প্রথা। যার মধ্যে অন্যতম রহস্যময় ও বিরল একটি আচার হল ‘শত্রুবলি’। মহানবমীর রাতে অনেক বনেদি পরিবারে এই ছায়াবলি আজও নিভৃতে পালিত হয়। এটি ছাগল বা মোষ বলির মতো কোনও প্রাণীবলি নয়। তবে এর ভাবগাম্ভীর্য ও নিষ্ঠা বহুগুণ বেশি। কালিকাপুরাণের ৬৭তম অধ্যায়ে এই বলিদানের সুস্পষ্ট উল্লেখ মেলে। শাস্ত্রে নির্দেশ রয়েছে,
“যবচুর্ণময়ং কৃত্বা রিপুং মৃন্ময়মেব বা।
শিরশ্ছিত্বা বলিং দদ্যাৎ কৃত্বা তস্য তু মন্ত্রতঃ।।”
মহানবমীর তিথিতে যখন রাত্রি ঘনীভূত হয়, তখন শুরু হয় এই গুপ্ত পুজো। সম্পূর্ণ যবচূর্ণ বা ছাতু অথবা কাদা মাটি দিয়ে একটি শত্রুর পুতুল বা অবয়ব তৈরি করা হয়। প্রতিমা তৈরির পর শুরু হয় তার বিশেষ সংস্কার। আলতা বা রক্তবর্ণের তরল দিয়ে সেই কৃত্রিম শত্রুকে স্নান করানো হয়। কপালে পরানো হয় লাল চন্দনের তিলক। পরানো হয় লাল কাপড় ও রক্তবর্ণের মালা। গলায় লাল সুতো বেঁধে এবং নাভিতে একটি কৃত্রিম শলাকা বিদ্ধ করে শত্রুকে যেন সম্পূর্ণরূপে সংহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এরপর সেই কৃত্রিম অবয়বকে উত্তরদিকে মাথা রেখে শোয়ানো হয়। খড়্গ হাতে সাধক বা পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করে এক কোপে তার শিরশ্ছেদ করেন। এই বলি কিন্তু দুর্গা দেবীকে দেওয়া হয় না। কালিকা পুরাণ মতে, এই কাটা মুণ্ডটি স্কন্দ ও বিশাখ—এই দুই দেবতাকে উৎসর্গ করা হয়।
