www.machinnamasta.in

ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্লী গং গণপতয়ে বর বরদ সর্বজনস্ময়ী বশমানয় ঠঃ ঠঃ

May 27, 2024 6:23 am

গঙ্গা নদী (Ganges River) ভারত ও বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। এটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বৃহৎ নদীপ্রণালী সমূহের মধ্যে অন্যতম। এর ইংরেজি উচ্চারণ ‘গ্যানজেস’ সংস্কৃত নাম ‘গঙ্গা’-এর অপভ্রংশ, যা একজন গ্রিক ইতিহাসবেত্তা কর্তৃক প্রথম ব্যবহূত হয়েছিল। সমগ্র ভারতবর্ষ এবং যে সকল স্থানে ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃতি ঘটেছিল সে সব অঞ্চলে গঙ্গা নামটি সুপরিচিত। এর নিষ্কাশন অববাহিকা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের একটি এবং এ অঞ্চলেই ইন্দো-আর্য সভ্যতা বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে। গঙ্গা ছাড়াও এ নদীপ্রণালী অনেক গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যমুনা, কালী, কার্ণালি, রামগঙ্গা, গন্ডক এবং কোশি। এসবের সবকটিই হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎসারিত এবং প্রধানত গলিত বরফ থেকে এদের সৃষ্টি। মূলত গঙ্গা দুটি উপনদী থেকে সৃষ্ট- ভাগীরথী এবং অলকানন্দা।

সদ্যঃ পাতকসংহন্ত্রী সদ্যোদুঃখবিনাশিনী।
সুখদা মোক্ষদা গঙ্গা গঙ্গৈব পরমা গতিঃ।।
–যিনি পাপহরণ করেন, দুঃখ বিনাশ করেন; সুখদাত্রী, মোক্ষদাত্রী গঙ্গা, সেই গঙ্গাই আমার পরম গতি।

গঙ্গার প্রণামমন্ত্র এটি। কলিযুগে অবতার হলেন কল্কি, শাসক হল ধনলোভী এবং বুদ্ধিজীবী শাস্ত্রহীন কিন্তু গঙ্গাই পরম তীর্থ। মহাভারতের বনপর্বে বলা হয়েছে—সত্যযুগে সকল স্থানই তীর্থ, ত্রেতায় পুষ্করের শ্রেষ্ঠত্ব, দ্বাপরের শ্রেষ্ঠ তীর্থ কুরুক্ষেত্র, কলিযুগের শ্রেষ্ঠ তীর্থ হল গঙ্গা।

…সর্ব্বং কৃতযুগে পুণ্যং ত্রেতায়াং পুষ্করং স্মৃতম্।
…দ্বাপরে তু কুরুক্ষেত্রং গঙ্গা কলিযুগে স্মৃতা।
গঙ্গাকে (Ganga) তিন ভাবে দেখা যেতে পারে। এক– আর্য্যাবর্ত্তস্থিত পবিত্র নদীবিশেষ। দুই– দেবীবিশেষ, গঙ্গাদেবী। তিন—হ্লাদিনী-প্রভৃতি সপ্তগঙ্গা। শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণে গঙ্গার কথা আছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে ৭৫ সূক্তে ঊনিশটি নদীর স্তুতি আছে। স্তুতি করেছেন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি সিন্ধুক্ষিৎ। সিন্ধু নদীর পর গঙ্গার উল্লেখ আছে সেখানে। ঋগ্বেদের ষষ্ঠ মণ্ডলের ৬৫ সূক্তে গঙ্গার কথা পাওয়া যায়। তৃতীয় মণ্ডলের ৫৭ সূক্তে জাহ্নবীর উল্লেখ আছে। জহ্নু মুনির কথা সকলেই জানেন। আচার্য মনু গঙ্গার মাহাত্ম্য কীর্তন করেছেন– শূদ্রদের রাজ্যেও কেউ বাস করতে পারেন যদি সেখানে গঙ্গা প্রবাহিত হয়, সেই দেশে যদি মূর্খরা বাস করেন তবু সেই দেশ পবিত্র বলে পরিগণিত হবে। অত্রিসংহিতাতে গঙ্গার কথা রয়েছে। বামনপুরাণে দেখা যায়, মেনকার তিন কন্যা—রাগিনী, কুটিলা ও কালী। কুটিলাকে শিবের ব্রহ্মতেজ গ্রহণ করতে বললে তিনি তাঁর অক্ষমতার কথা জানান। তখন তিনি অভিশপ্ত হয়ে মর্ত্যে বহমান হন। ওই কুটিলা নদীই গঙ্গা। কুটিলা নদী শিবতেজ ধারণ করে শরবনে নিক্ষেপ করেন, তিনিই কার্তিকের মা। তাই কার্তিক হলেন গাঙ্গেয়। মহাভারতে গঙ্গা হলেন দেবব্রত-ভীষ্মের মাতা।

রামায়ণের (Ramayana) বালখণ্ডে সগর রাজার কাহিনি আছে। সগরের ৬০ হাজার পুত্র যজ্ঞাশ্ব খুঁজতে গিয়ে পাতালে নিহত হন। সগরের পৌত্র দিলীপ অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। শিবের আদেশে দিলীপের দুই রাণী সঙ্গমে লিপ্ত হয়ে ভগীরথের জন্ম দেন। ভগে ভগে মিলনের ফলে জন্ম বলে তাঁর এমন নাম। ভগীরথ মর্ত্যে গঙ্গাকে আনলেন, তাই গঙ্গার অন্য নাম ভাগীরথী। 

শ্রীকৃষ্ণ (Sri Krishna) গঙ্গার প্রেমে পড়েছিলেন। তখন রাধা বাক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গাকে পান করতে উদ্যত হন। ভীতা গঙ্গা শ্রীকৃষ্ণের চরণে আশ্রয় নেন। পরে কৃষ্ণের নখাগ্র থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি, তাই তাঁর অন্য নাম বিষ্ণুপদী। ব্রহ্মার অনুরোধে কৃষ্ণ পরে গঙ্গাকে বিবাহ করেন। পদ্মাপুরাণ অনুসারে, গঙ্গা সুরূপা, অপরূপা, রূপলাবণ্যময়ী। দেহবর্ণ শঙ্খের মতো বা কুন্দ কুসুমের ন্যায় শ্বেতশুভ্র। শুভ্রবসনা দেবীর কন্ঠে শুভ্র মুক্তার মালা। নানা অলঙ্কারে ও আভরণে দেবী ভূষিতা। তিনি দ্বিভূজা—এক হাতে সুধা ও জ্ঞানের প্রতীক অক্ষসূত্র, অন্য হাতে শ্বেত পদ্ম। সুদণ্ডী, সুবদনী, সুপ্রসন্না ও করুণাময়ী। মস্তকে শ্বেতচ্ছত্র, চন্দ্রপ্রভার ন্যায় জ্যোতির্ময়ী। দেবীর বাহন মকর।

মহাভারতে (Mahabharat) গঙ্গার অন্য চিত্র পাওয়া যায়। কুরুবংশীয় রাজা প্রতীপ হরিদ্বারে বসে তপস্যা করছিলেন, সেখানে গঙ্গা গিয়ে তাঁকে বিবাহ করতে চান। কিন্তু প্রতীপ সম্মত হন না। জানান, তাঁর পুত্রের সঙ্গে গঙ্গার পরিণয় হবে। গঙ্গা তাঁকে বলেন, প্রতীপের পুত্র তাঁর কোনও কাজে যেন বাধা না দেন। গঙ্গা তার পর চলে যান। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অভিশপ্ত অষ্টবসুর গর্ভধারিনী হওয়া। যথাকালে ইক্ষাকু বংশীয় রাজা মহাভীষ পুনর্জন্ম লাভ করেন প্রতীপের ঔরসে। তাঁর নাম শান্তনু। তিনি নষ্টপ্রায় বংশের রক্ষক ছিলেন বলে এমন নামকরণ—শান্ততনু। শান্তনু যুবক হলে প্রতীপ তাঁকে জানান, এক জন দিব্য রমণী আসবেন, কোনও পরিচয় না জানতে চেয়ে শান্তনু যেন তাঁকে বিবাহ করেন। এই কথা বলে প্রতীপ বাণপ্রস্থে চলে গেলেন। শান্তনু হস্তিনার রাজা হলেন। 

যথাকালে গঙ্গা এলেন। দু জন দুজনকে দেখে মুগ্ধ হলেন। শান্তনু তাঁকে স্ত্রী হিসাবে পাওয়ার জন্য প্রস্তাব দিলেন। অষ্টবসুর কথা ভাবতে ভাবতে শরীরিণী গঙ্গা প্রতীপপুত্রকে বললেন, 

ভবিষ্যমি মহিপাল মহিষী তে বশানুগা।
যত্তু কুর্য্যামহং রাজন্ শুভং বা যদিবাশুভম্।
ন তদ্বারয়িতব্যাস্মি ন বক্তব্যা তথাপ্রিয়ম্। 
–মহারাজ, আমি যা করব, ভাল হোক বা মন্দ, তুমি বাধা দেবে না এবং আমাকে কোনও অপ্রিয় কথা বলবে না। সে রূপ করলে তখনই তোমাকে ত্যাগ করব। তুমি এই শর্তে সম্মত হলে আমি তোমার মহিষী হতে রাজি আছি। 

একে একে সাত পুত্রের জন্ম দিয়ে গঙ্গা তাদের জলে নিক্ষেপ করে বলতেন, এই তোমার প্রিয় কার্য করলাম। শান্তনু চুক্তিবদ্ধ তাই কিছু বলতেন না কিন্তু দুঃখ-শোকে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। অষ্টম পুত্র জন্মানোর পর শান্তনু গঙ্গাকে বললেন, পুত্রঘাতিনী, তুমি কে, কেন এই মহাপাপ করছ? হে পুত্রঘ্নি, তোমার পাপের সীমা নেই। গঙ্গা জবাব দিলেন, তুমি পুত্র চাও অতএব এই পুত্রকে বধ করব না, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি আর থাকব না। আমি বিদায় নিচ্ছি।

অহং গঙ্গা জহ্নুসুতা মহর্ষিগণসেবিতা।
দেবকার্য্যার্থ-সিদ্ধ্যর্থমুষিতাহং ত্বয়া সহ। 
আমি মহর্ষিদের দ্বারা সেবিতা জাহ্নবী গঙ্গা। দেবতাদের কার্যসিদ্ধির জন্য তোমার সঙ্গে এতকাল বাস করেছি। গঙ্গা নিজের সম্যক পরিচয় দিলেন এবং বসুগণের কাহিনি সবিস্তারে বললেন। বশিষ্ঠের হোমধেনু চুরি করেছিলেন অষ্টবসু। তাই তারা অভিশপ্ত হয়ে মর্ত্যে এসেছিল। আমি ছিলাম গর্ভধারিনী। আট জনের মধ্যে দ্যু নামক বসুর অপরাধ ছিল সবচেয়ে বেশি, তাই সে বেশি দিন মর্ত্যে থাকবে। এই পুত্রকে গঙ্গার দান বলে মনে করবে। গঙ্গা নবজাতককে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন। শান্তনু শোকাকুল হয়ে প্রাসাদের অভ্যন্তরে চলে গেলেন। 

তার পর অনেক দিন কেটে গিয়েছে। শান্তনুর প্রার্থনায় গঙ্গা যুবক পুত্র দেবব্রতকে সঙ্গে নিয়ে একটি নির্জন স্থানে শান্তনুর সঙ্গে দেখা করলেন। পত্নী ও পুত্রকে দেখে শান্তনু প্রসন্ন হলেন। গঙ্গা বললেন, এই তোমার পুত্র—শাস্ত্র ও শস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। নিখিল বিশ্বের সব বিদ্যা সে শিখেছে। বশিষ্ঠের কাছে শাস্ত্রজ্ঞান ও পরশুরামের কাছে শস্ত্রজ্ঞান লাভ করেছে দেবব্রত। একে নিয়ে যাও। যুবরাজ করো। এ হল গঙ্গার দান।

মহেষ্বাসমিমং রাজন্ রাজধর্ম্মার্থকোবিদম্। 
ময়া দত্তং নিজং পুত্রং বীরং বীর গৃহং নয়। 
হে রাজন, মহাধনুর্ধর ও রাজধর্মার্থজ্ঞানী এই পুত্রটিকে তোমার হাতে দিচ্ছি। হে বীর, তোমার এই বীর পুত্রটিকে নিজ গৃহে নিয়ে যাও। এর পর গঙ্গাকে আর দেখতে পাওয়া যায় না। মহাভারতে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ মেলে দেবব্রত-ভীষ্মের মৃত্যুর পরে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। ভীষ্ম পতিত হয়েছেন। শরশয্যায় শুয়ে তিনি মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। ওদিকে যুধিষ্ঠির রাজা হয়েছেন। মাঘ মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে ভীষ্ম দেহত্যাগ করেন। তখন জীবিত কৌরব, পাণ্ডব ও যাদবগণ ভীষ্মতর্পণ করতে গঙ্গায় নেমেছেন। সেই সময় গঙ্গা আবার শরীর ধারণ করেন। পুত্রশোকে তিনি বিহ্বলা। মাতৃহৃদয় বাষ্পাচ্ছন্ন। তিনি বিলাপ করতে করতে জল থেকে উঠে এলেন। 

কে আমার মহাবীর পুত্রকে হত্যা করেছে? আমার মহান পুত্র রাজনীতি শিখেছেন মহাত্মা বশিষ্ঠের কাছে। আমার বীর সন্তান শস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন চিরজীবী ধনুর্ধর ব্রাহ্মণ পরশুরামের নিকট। গুরু পরশুরামও তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। অম্বাকে কেন্দ্র করে তাঁদের যুদ্ধ হয়েছিল। আমার সেই পুত্রকে কিনা হত্যা করেছে শিখণ্ডী, যে এক কালে নারী ছিল, লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ হয়েছে। আমি সে সব কথা বিশ্বাস করি না। আমার পুত্রকে অন্যায় ভাবে, ছলপূর্বক হত্যা করা হয়েছে। আমার পুত্র শিখণ্ডীর বাণে নিহত হয়েছেন, এই কথা ভাবতে আমার বুক ফেটে যায়। এই কি সেই শিখণ্ডী যে পূর্বজন্মে অম্বা ছিল! হা ঈশ্বর!  

বিলাপিনী গঙ্গার রূপ পালটাতে শুরু করেছে। শুভ্র পণ্যপ্রবাহ আস্তে আস্তে জ্যোৎস্না থেকে চন্দন, তার পর ধীরে ধীরে বর্ণহীন হতে শুরু করল। কৃষ্ণ ও কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এলেন দেবী গঙ্গাকে সান্ত্বনা দিতে।

আপনার পুত্র ছিলেন শাপগ্রস্থ। তিনি বশিষ্ঠের কাছে রাজনীতি ও অন্যান্য বিদ্যা শিখেছেন বটে কিন্তু তিনি বশিষ্ঠ দ্বারা অভিশপ্ত। তিনি শস্ত্রবিদ্যা শিখেছিলেন পরশুরামের কাছে সেই ব্রহ্মচারী অপুত্রক গাঙ্গেয় শিখণ্ডীর বাণে নয়, অর্জুনের বাণে শরশয্যা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নিজের মৃত্যুর উপায় তিনি নিজেই যুধিষ্ঠিরকে জানিয়েছিলেন। এ হল স্বেচ্ছামৃত্যু। 

কাকে যে শিখণ্ডী করা হল তিনি বুঝতে পারলেন না। ব্যাসদেব ও শ্রীকৃষ্ণের প্রবোধবাক্য শুনে দেবী গঙ্গা অন্তর্হিতা হলেন। 

দেবী তথা নদী গঙ্গার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত শিব। সেই সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের তিনটি ধারাও। সাংখ্য, ন্যায় ও অদ্বৈত। যজ্ঞাশ্ব খুঁজতে গিয়ে কপিল মুনির ধ্যানভঙ্গ করেছিলেন সগর রাজার ৬০ হাজার পুত্র। সাংখ্য দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা কপিল মুনি তাঁদের ভস্ম করে দেন। সগর রাজার উত্তরপুরুষ ভগীরথ মর্ত্যে গঙ্গাকে এনে পূর্বপুরুষদের সৎকার করেন। ন্যায় দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম গঙ্গাদ্বারের নিম্নভাগে রচনা করেন কুশাবর্ত তীর্থ। আচার্য শঙ্কর যে অমর গঙ্গাস্তোত্র রচনা করেছিলেন তাতে অদ্বৈত-র মূল তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।  

     

গঙ্গাসাগরের পৌরাণিক কাহিনী মূলত কথা বলে, জীবন ও মৃত্যুর বৃত্ত এবং মোক্ষ সম্পর্কে আর এই ভক্তির মুখ্য কেন্দ্রস্থল হল কপিল মুনির মন্দির। ভাগবত পুরাণ অনুযায়ী, কপিল মুনির পিতা ছিলেন মহর্ষি কর্দম মুনি এবং মাতা ছিলেন পৃথিবী শাসক স্বয়ম্ভব মনুর কন্যা দেবহূতি। কর্দম মুনি তাঁর পিতা ভগবান ব্রহ্মার আদেশ অনুযায়ী কঠোর তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং কর্দম মুনিকে স্বয়ম্ভব মনুর কন্যা দেবহূতিকে বিবাহ করতে বলেন এবং ভবিষ্যতবাণী করেন, কর্দম মুনি ও দেবহূতির ৯টি কন্যা হবে এবং সময়ের সাথে সমগ্র সৃষ্টিকে জীবিত সত্ত্বা দিয়ে পূর্ণ করবে। এছাড়াও ভগবান বিষ্ণু জানান, তিনি নিজে অবতার রূপে কর্দম মুনি ও দেবহূতির সন্তান হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন এবং সমগ্র বিশ্বকে সাংখ্য দর্শন প্রদান করবেন। কপিল মুনি প্রথম জীবনে বেদের অগাধ জ্ঞান অর্জন করেন এবং সাংখ্য দর্শনকে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ করেন।

গঙ্গাসাগরের কিংবদন্তী শুরু হয় রামায়ণের রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ রাজা সগরের উপাখ্যান দিয়ে। ইক্ষাকু বংশের রাজা সগর ঋষি ঔর্বের নির্দেশে শত অশ্ব্মেধ যজ্ঞ করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কথিত ছিল, কেউ যদি শত অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পূর্ণ করে তাহলে সে সমগ্র পৃথিবীতে আধিপত্য অর্জন করতে পারবে। একমাত্র দেবরাজ ইন্দ্র তার আগে শত অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন। সগরের শত অশ্বমেধ যজ্ঞের সঙ্কল্প শুনে ইন্দ্র আশঙ্কিত হয়ে পড়েন সগর সফল হলে তিনি মর্যাদা হারাবেন। ভীত ইন্দ্র, সগরের যজ্ঞের অশ্ব কপিল মুনির আশ্রমে লুকিয়ে রাখেন।

যজ্ঞের অশ্ব খুঁজে না পেয়ে ক্রুদ্ধ সগর, তার ৬০,০০০ পুত্রকে নিখোঁজ ঘোড়াটির সন্ধানে পাঠান। পথে সবকিছু ধ্বংস করতে করতে সগরপুত্ররা পৌঁছন কপিল মুনির আশ্রমে। ধ্যানরত কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছে সগরপুত্ররা অশ্বটি খুঁজে পেয়ে কপিল মুনির ধ্যানভঙ্গ করে এবং তাঁকে অপমান করে। ক্রুদ্ধ কপিল মুনি চোখ খুলে সগরের ৬০,০০০ পুত্রকে ভস্ম করে তাদের আত্মা নরকে পাঠিয়ে দেন। বহু বছর পর, সগরের বংশধর অংশুমান কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছে যজ্ঞের অশ্বটিকে খুঁজে পান। অংশুমান কপিল মুনিকে তুষ্ট করবার জন্য তপস্যা করেন। অংশুমানের তপস্যায় তুষ্ট কপিল মুনি অশ্বটিকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। কপিল মুনির কাছ থেকে অংশুমান জানতে পারেন,গঙ্গার পবিত্র জলে শ্রাদ্ধকর্মাদি করলে তবেই সগরপুত্রদের আত্মা মুক্তি পাবে। কিন্তু অংশুমান বা তার পুত্র দিলীপ কেউই গঙ্গাকে মর্তে আনতে অসমর্থ হন। দিলীপের পুত্র রাজা ভগীরথ প্রথমে ব্রহ্মা ও পরে বিষ্ণুর আরাধনা করে গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান। সন্তুষ্ট ভগবান বিষ্ণু ভগীরথকে সতর্ক করেন, গঙ্গার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সেই দুরন্ত বেগে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ভগীরথ তখন ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা করেন, শিব যেন তার জটায় গঙ্গাকে ধারণ করে তার বেগ নিয়ন্ত্রণ করেন। শিবের জটায় গঙ্গার দ্রুতবেগ হ্রাস পায় এবং তারপর গঙ্গা মর্তে অবতরণ করেন। অবশেষে ভগীরথ পবিত্র গঙ্গা জলে তাঁর ৬০,০০০ পূর্বপুরুষের আত্মার শ্রাদ্ধকর্মাদি করে তাদের আত্মাকে নরক থেকে মুক্ত করেন।

যযুগ যুগে এই সব পৌরাণিক কাহিনী কিংবদন্তি ও পরে কিংবদন্তি থেকে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছে। রাজা ভগীরথের নাম অনুসারে তাই গঙ্গার নাম হয় ভাগীরথী এস রাজা সগরের নামে সমুদ্রের নাম হয় সাগর। সমুদ্র ও নদীর মধ্যবর্তী দ্বীপের নাম হয় সাগরদ্বীপ।

পৌরাণিক এই আখ্যানে বিশ্বাস রেখে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী মোক্ষের সন্ধানে মকর সংক্রান্তির সময়ে গঙ্গাসাগর মেলায় যান। তারা বিশ্বাস করেন, সাগরসঙ্গমের পবিত্র জলে ডুব দিলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায়। এই বিশ্বাসে ভর দিয়ে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ কপিল মুনির মন্দির দর্শন করেন ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’।

গঙ্গা নদী
ভারতের দীর্ঘতম ও শ্রেষ্ঠ নদী হল গঙ্গা। যার মোট দৈর্ঘ্য হল 2510 কিলোমিটার। উত্তরাখণ্ডের উত্তর কাশি জেলার গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা থেকে গঙ্গা নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তি স্থলে এর নাম ভাগিরথী । ভাগিরথী দেব প্রয়াগে অলকানন্দার সাথে মিলিত হয়েছে এবং নাম হয়েছে গঙ্গা। অলকানন্দার উৎপত্তি বদ্রীনাথের কাছে শতপথ হিমবাহ। অলকানন্দা ধৌলি এবং বিষ্ণুগঙ্গার মিলনে গঠিত। এদের মিলিত স্থান যোশীমঠ বা বিষ্ণুপ্রয়াগ। অলকানন্দার অপর শাখা পিন্ডার কর্ণপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে। অলকানন্দার সাথে আবার মন্দাকিনি বা কালিগঙ্গা রুদ্রপ্রয়াগে মিলিত হয়েছে।

গঙ্গা নদী: উৎপত্তি ও গতিপথ
গঙ্গার উৎপত্তি ও পার্বত্য গতি: গঙ্গোত্রী থেকে হরিদ্বার পর্যন্ত প্রায় 320 কিলোমিটার গঙ্গার উচ্চ বা পার্বত্য গতি। কুমায়ুন হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা থেকে ভাগীরথী নামে উৎপন্ন হয়ে প্রথমে পশ্চিমে এবং পরে দক্ষিণের সংকীর্ণ গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেবপ্রয়াগে অলকানন্দার সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং এই দুই মিলিত স্রোত গঙ্গা নামে পরিচিত।

গঙ্গার মধ্য গতি এবং এই অংশে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হওয়া উপনদী: গঙ্গা, দেবপ্রয়াগ থেকে প্রথমে পশ্চিমে এবং পরে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে নাগাটিব্বা ও শিবালিক পর্বতশ্রেণী অতিক্রম করে হরিদ্বারের কাছে সমভূমিতে অবতরণ করেছে এবং প্রথমে দক্ষিণে এবং পরে দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ এবং বিহার রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত গঙ্গার মধ্যগতিতে বহু উপনদী এসে মিশেছে। তাদের মধ্যে রামগঙ্গা, গোমতী, ঘর্ঘরা, গণ্ডক, বুড়ীগণ্ডক, কোশী প্রভৃতি নদীগুলো হল গঙ্গার বাং তীরস্থ উপনদীগুলির মধ্যে যমুনা ও শোন উল্লেখযোগ্য।
গঙ্গার নিম্নগতি এবং এই অংশে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হওয়া উপনদী: পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার গিরিয়ার কাছে গঙ্গা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ভাগীরথী ও পদ্মা নামে দক্ষিণ ও দক্ষিণ -পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। এই অংশ থেকেই গঙ্গার নিম্নগতি ও ব-দ্বীপ প্রবাহের শুরু হয়েছে। ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী ব-আকৃতির দ্বীপ পৃথিবীর সব থেকে বড় ব-দ্বীপ। যদিও এর অধিকাংশ অংশই স্থান বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত। মুর্শিদাবাদ শহর থেকে হুগলী শহর পর্যন্ত গঙ্গার নাম ভাগীরথী এবং হুগলী শহর থেকে মোহনা পর্যন্ত গঙ্গার নাম হুগলী নদী। ভাগীরথী ব-দ্বীপের দক্ষিণে হুগলী নাম প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
 

গঙ্গা নদীর গতিপথের মানচিত্র
গঙ্গা নদী: দৈর্ঘ্য
গঙ্গা নদীর দৈর্ঘ্য হল 2510 কিলোমিটার, এর মধ্যে 2071 কিলোমিটার ভারতের অন্তর্গত। নদীটি কুমায়ুন হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা থেকে উৎপন্ন হয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এটি ভারতের দীর্ঘতম নদীগুলির মধ্যে একটি অন্যতম নদী।

গঙ্গা নদীর তীরবর্তী শহর
গঙ্গা নদীর তীরবর্তী শহর গঙ্গা নদীর তীরে ভারতের অনেকগুলি ছোট বড়ো শহর গড়ে উঠেছে। উচ্চ, মধ্য ও নিম্নগতিতে সমগ্র অঞ্চল মিলিয়ে গঙ্গার মোট দৈর্ঘ্য 2510 কিলোমিটার এবং এর অববাহিকার আয়তন 951600 বর্গ কিলোমিটার। হরিদ্বার থেকে মোহনা পর্যন্ত বিশাল অববাহিকাংশ গঙ্গার পলিসঞ্চয়ের ফলে অতন্ত্য উর্বর এবং শস্য উৎপাদনে উল্লেখ্যযোগ্য। তাই গঙ্গার উভয় তীরে প্রাচীনকাল থেকে বহু জনপদ গড়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শহর গুলি হল -হরিদ্বার, কানপুর, এলাহাবাদ, বারাণসী, পাটনা,মুঙ্গের, ভাগলপুর। যমুনা নদীর তীরের শহরগুলির মধ্যে দিল্লী, মথুরা ও আগ্রা উল্লেখযোগ্য শহর।

গঙ্গার উপনদী
গঙ্গার উপনদী গুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় যথা- বাম তীরের উপনদী ও ডান তীরের উপনদী।

বাম তীরের উপনদী ডান তীরের উপনদী
রামগঙ্গা, গোমতী, কালি, গণ্ডক, কোশি ও ঘর্ঘরা যমুনা ও শোন
গঙ্গা নদীর শাখা নদী
গঙ্গা নদীর দুটি ধারা বা শাখা একটি ফারাক্কা বাঁধ থেকে এসে ভাগীরথী ও হুগলী নদী নামে মূলত দক্ষিণে প্রায় 260 কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে, অপরটি উৎপত্তিস্থল হতে 2200 কিলোমিটার দূরে গোয়ালন্দে যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়ে মিলিত প্রবাহ পদ্মা নামে আরও পূর্ব দিকে চাঁদপুর জেলায় মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। সবশেষে পদ্মা-মেঘনার মিলিত প্রবাহ মেঘনা নাম ধারণ করে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সাথে মিলিত হয়। পদ্মাকে মূলত গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়।

গঙ্গা নদী: নির্মিত বাঁধ
ফারাক্কা: ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীর উপর অবস্থিত একটি বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অবস্থিত। 1961 সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
তেহরি ড্যাম বা বাঁধ ভারতের সর্বোচ্চ বাঁধ এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ বাঁধগুলির মধ্যে একটি। এটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের তেহরির কাছে ভাগীরথী নদীর উপর নির্মিত বহুমুখী পাথর এবং মাটি ভরাট করে তৈরী করা কৃত্রিম বাঁধ।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গঙ্গা নদীর অববাহিকার দৈর্ঘ্যের শতকরা হিসাব
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গঙ্গা নদীর অববাহিকার দৈর্ঘ্যের শতকরা হিসাব নিচের টেবিলে দেওয়া হয়েছে।

রাজ্য গঙ্গার শতকরা দৈর্ঘ্য(%)
উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ 34.2
হিমাচল প্রদেশ 0.5
পাঞ্জাব ও হরিয়ানা 4.0
রাজস্থান 13.0
মধ্যপ্রদেশ ও ছত্রিশগড় 23.1
বিহার ও ঝাড়খন্ড 16.7
পশ্চিমবঙ্গ 8.3
দিল্লী 0.2
মোট দৈর্ঘ্য 100%…

collected

administrator

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *