ভাদ্রের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথি। চারদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। বসুন্ধরা তখন অন্যায়ের ভারে জর্জরিত। অসুরী শক্তির দাপটে ত্রস্ত জগৎ সংসার। ঠিক তখনই অন্ধকারকে ভেদ করে ধরায় নেমে এল এক অলৌকিক আলো। কংসের কারাগারের রুদ্ধ দরজার আড়ালে ঘটল সেই পরম কাঙ্ক্ষিত অলৌকিক ঘটনা। ভাদরের সেই গভীর রাতে অদ্ভুত রূপ নিল প্রকৃতি। শুভ লগ্নের বার্তা নিয়ে শান্ত হল নদ-নদীর জলধারা। বিকশিত হল থোকা থোকা পুষ্প। সুগন্ধী ও মৃদু বাতাস বইতে শুরু করল ধরাতলে। দেবলোকেও ছড়িয়ে পড়ল পরম আনন্দের শিহরণ।
বিশ্বচরাচরে প্রস্ফুটিত হল এক অলৌকিক পুণ্য মুহূর্ত। “নিশীথে তমউদ্ভূতে জায়মানে জনার্দনে ।
দেবক্যাং দেবরূপিণ্যাং বিষ্ণুঃ সর্বগুহাশয়ঃ ।
আবিরাসীদ্ যথা প্রাচ্যাং দিশীন্দুরিব পুষ্কলঃ ॥” (শ্রীমদ্ভাগবত)
মথুরার অন্ধকার কারাকোণে জন্ম নিলেন ভগবান জনার্দন। যেন পূর্বাকাশে উদিত হল এক পূর্ণচন্দ্র। কিন্তু সাধারণ মানবশিশুর মতো তাঁর আবির্ভাব ঘটেনি। বসুদেব ও
দেবকীর সামনে তিনি প্রকট হলেন স্বয়ং চতুর্ভুজ রূপে। তাঁর শ্রীঅঙ্গে শোভা পাচ্ছিল দিব্য অলংকার। চার হাতে ধরা ছিল শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। বর্ষামেঘের মতো শ্যামবর্ণ রূপ। বক্ষে শ্রীবৎস চিহ্ন ও পরম উজ্জ্বল কৌস্তুভ মণি। সেই ঐশ্বরিক রূপ দেখে বসুদেব তৎক্ষণাৎ উপলব্ধি করলেন, স্বয়ং নারায়ণ আজ তাঁর সন্তান রূপে অবতীর্ণ। তবে মাতৃহৃদয় তখন পরম ভক্তির পাশাপাশি আশঙ্কায় আকুল। পূর্বের সন্তানদের হারানোর যন্ত্রণা দেবকীর স্মৃতিতে তখনও জ্বলজ্বলে। কংসের ঘোর অত্যাচার থেকে সদ্যোজাতকে রক্ষা করতে তিনি ব্যাকুল হলেন। মায়ের কাতর আকুতি, ঈশ্বর যেন তাঁর ঐশ্বরিক রূপ সংবরণ করেন। পরমেশ্বরও মায়ের এই বাৎসল্য রসের আকুতি ফেরাতে পারলেন না। নিজ যোগমায়া শক্তিতে তিনি রূপ নিলেন এক সাধারণ সুন্দর মানবশিশুর।
