এ এক পৌরাণিক গল্প। কিন্তু আজও মানুষ তা বিশ্বাস। এভাবেই যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে প্রচারিত হয়েছে সেই গল্প। রাতের অন্ধকারে নিঝুম গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছে এক হিংস্র পদছাপ। কিন্তু সেই আঁধারে ভয়ের বদলে ঝরে পড়ে অলৌকিক এক প্রশান্তি। সিংহ নয়, প্রকাণ্ড এক ব্যাঘ্রের পিঠে সওয়ার স্বয়ং দেবী দশভূজা! মহিষাসুরমর্দিনীর বাহন হিসেবে সিংহকে দেখেই অভ্যস্ত আমাদের চোখ। কিন্তু সনাতন ধর্মে দেবীর এই বাগেশ্বরী রূপও পরম পূজনীয়। এমনই এক অলৌকিকতা ঘেরা লোকগাথার রাজত্ব বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার হায়াঘাট ব্লকের ছোট্ট গ্রাম বাউরামে।
গ্রামবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস, এই বাউরামই দেবী দুর্গার জন্মস্থান। প্রচলিত জনশ্রুতি, প্রতি রাতে দেবী এখানে ব্যাঘ্রবাহনা রূপে গ্রাম পরিক্রমা করতেন। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকেই দাবি করেন, রাতের নিস্তব্ধতায় তাঁরা স্বচক্ষে দেখেছেন সেই মহিমান্বিত দৃশ্য। এই বিশ্বাস থেকেই দেবী এখানে পূজিত হন ‘বাঘেশ্বরী দুর্গা’ হিসেবে।
বাউরামের এই দেবস্থান কোনও মানুষের তৈরি নয়। এটি এক স্বয়ম্ভূ থান। গ্রামবাসীরা নিজেরাই আবিষ্কার করেছিলেন এই অলৌকিক স্থানটি। ভগবতীর এই থানে মূল আকর্ষণ দুই থেকে তিন ফুট উঁচু একটি প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড। স্থানটি ‘ভগবতীর্থ থান’ নামে পরিচিত। একে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে বহু রহস্যময় কাহিনি। একসময় নাকি গ্রামের সাধারণ মানুষের ভিটেয় আচমকাই অচেনা শিলাখণ্ড প্রকট হত। রহস্যময় সেই পাথরগুলি শ্রদ্ধার সঙ্গে ভগবতী থানে ফিরিয়ে দিতেন গ্রামবাসীরা। প্রথাগত প্রতিমা বা জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপ এখানে নেই। কিন্তু ভক্তি ও শ্রদ্ধায় এতটুকু খামতি নেই কোথাও। শাস্ত্রীয় নিয়ম ও নবরাত্রির তিথি মেনে প্রতিদিন পুজো হয় এই ভগবতীর থানে। পিছিয়ে পড়া এই জনপদে বাগেশ্বরী দেবীই আশার একমাত্র আলোকবর্তিকা। নবরাত্রির দিনগুলিতে দেবীর অশেষ কৃপা পেতে আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামবাসীরা। এই লোকায়ত বিশ্বাস ও অলৌকিক মাহাত্ম্যই বাউরাম গ্রামকে দিয়েছে এক অন্য পৌরাণিক মাত্রা।
