দেবী দুর্গা মানেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশটি হাতের এক লাবণ্যময়ী রূপ। তবে, শাস্ত্রের গহীনে রয়েছে দেবীর বিবিধ বিবরণ। কেবল দশভূজা নন, পুরাণ থেকে তন্ত্র—বিভিন্ন শাস্ত্রে দেবীর বহুবিধ বাহুর বৈচিত্র্যময় ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। রূপভেদে দেবীর এই হাত মূলত তাঁর অনন্ত শক্তিরই প্রকাশ। সাধারণ মানুষ দেবীকে দশভূজা হিসেবে চিনলেও মূল ‘দেবীমাহাত্ম্যম্’ গ্রন্থে দেবীকে হাজার হাতের ‘সহস্রভূজা’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। শাস্ত্রের এই অসীম বাহুর রূপ আসলে দেবীর অপার ক্ষমতার প্রতীক। অর্থাৎ দুর্গার ক্ষমতা নির্দিষ্ট কোনও গণ্ডিতে বাঁধা নয়, তা অসীম ও সর্বত্র বিস্তৃত। শ্রীশ্রীচণ্ডী’ পাঠে দেবী দুর্গার তিনটি ভিন্ন রূপের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রথম পর্বে মহাকালী রূপে মায়ের হাত ১০টি, আবার মাঝের পর্বে মহিষাসুরমর্দিনী মহাকালী বা মহালক্ষ্মী রূপে মায়ের হাত ১৮টি। শেষ পর্বে মহাসরস্বতী রূপে মা আবার আটটি হাত নিয়ে আবির্ভূত হন।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী দশ দেবতা দেবীকে ১০টি অস্ত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু পুরাণ মন দিয়ে পড়লে দেখা যায়, শিব, বিষ্ণু, বায়ু, ব্রহ্মা সহ প্রায় ১৫ জন দেবতা মাকে বহু অস্ত্র ও অলঙ্কার দিয়েছিলেন। তাই দেবীর হাতের সংখ্যা অস্ত্রের হিসাব দিয়ে বিচার করা শক্ত।বাংলার দুর্গাপুজোয় আমরা যে ১০ হাতের মূর্তি দেখি, তা প্রধানত কালিকা পুরাণ ও দেবী পুরাণের অনুশাসন মেনে তৈরি। প্যান্ডেলের এই দশভূজা রূপটি মূলত রূপকার ও শাস্ত্রীয় আচার মেনে বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এটিই দেবীর একমাত্র শাস্ত্রীয় রূপ নয়। দেবীর এই বহু হাতের রূপ আসলে মহাজাগতিক শক্তির সংহতি নির্দেশ করে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল শক্তি একত্রিত হওয়াকে বোঝায়। যখন কোনও একক দেবতা দানবদের হারাতে পারছিলেন না, তখন সব দেবতার তেজ একসঙ্গে মিশে জন্ম নেয় বহু বাহু যুক্ত এই পরমাপ্রকৃতি, যা অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে সক্ষম।
