হিন্দু ধর্মের অন্যতম দেবতা জগন্নাথ দেবকে নিয়ে আছে বিচিত্র সব কাহিনী। এমন বহু কাহিনী আছে যা হয়তো অনেক মানুষ এখনও জানেন না। নীলাচলের রত্নবেদি ছেড়ে জগন্নাথদেব যেখানে দীর্ঘ এক শতকেরও বেশি সময় আত্মগোপন করেছিলেন, সেই রহস্যময় পুণ্যভূমি আজও বিরাজমান। ওড়িশার সুবর্ণপুর জেলার কোটসমলাই গ্রামের ত্রিকূট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘পাতালি শ্রীক্ষেত্র’। লোকচক্ষুর অন্তরালে যেখানে বিশ্বনিয়ন্তা প্রায় ১৪৪ বছর লুকিয়ে ছিলেন। সেই পবিত্র স্থানকে ঘিরে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি পুরীর গজপতি মহারাজ দিব্যসিংহ দেবের এই স্থান পরিদর্শন ভক্তকুলে এক পরম আবেগের জন্ম দিয়েছে। শ্রীক্ষেত্রের স্থায়ী ধামের বাইরে মহাপ্রভুর এই গুপ্ত লীলাক্ষেত্র যেন ইতিহাসের এক অলৌকিক অধ্যায়। ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতা ওলটালে জানা যায়, অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে যখন যবন সেনাপতি রক্তবাহু পুরীর শ্রীমন্দির আক্রমণ করেন, তখন ওড়িশার তৎকালীন রাজা শোভনদেব বিগ্রহ রক্ষা করতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তিনি ত্রিমূর্তি নিয়ে সুবর্ণপুরের গোপালীর এই ত্রিকূট পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন।
একটি প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নিচে মাটির অতলে লুকিয়ে রাখেন জগন্নাথ, বলভদ্র ও দেবী সুভদ্রার পবিত্র বিগ্রহ। এর পর দীর্ঘ ১৪৪ বছর শ্রীজগন্নাথ ধাম শূন্য ছিল। পরবর্তীতে সোমবংশীয় রাজা যযাতি কেশরী এই গুপ্ত বিগ্রহগুলির সন্ধান পান এবং পুরীতে নতুন মন্দির নির্মাণ করে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। শুধু রক্তবাহুই নয়, পরবর্তীতে কালাপাহাড়ের আক্রমণের সময়েও মহাপ্রভুর বিগ্রহকে এখানে সুরক্ষিত রাখা হয়েছিল। ‘মাদলাপাঞ্জি’ থেকে শুরু করে ‘সোনেপুর ইতিহাস’-এর মতো একাধিক প্রাচীন গ্রন্থে এই ঘটনার অকাট্য প্রমাণ মেলে। গবেষকদের মতে, পুরী যদি মহাপ্রভুর প্রকাশ্য লীলাভূমি হয়, তবে পাতালি শ্রীক্ষেত্র তাঁর অন্তরাল সাধনার পরম পবিত্র ধাম। শাক্ত, বৌদ্ধ এবং বৈষ্ণব—এই তিন ধর্মের এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র এই সুবর্ণপুর। প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) এই স্থানের প্রাচীনত্ব ও পুরীর মন্দিরের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক যোগসূত্র স্বীকার করে নিয়েছে আগেই। শুধু তাই নয়। পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোট মন্দিরও পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয়। পুরী মন্দিরের তরফে ২০১১ তে পাঠানো ত্রিমূর্তি সেখানে স্থাপনা করা হয়েছে।
