ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব আমাদের সকলের কাছেই এক বিস্ময়। তিনি কতটা মানুষ আর কতটা অবতার তা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। সেই মহামানব রামকৃষ্ণ শিশুকালে ছিলেন গদাধার। হুগলির এক নিভৃত গ্রাম কামারপুকুর। সেখানেই ১৮৩৬ সালের এক ফাল্গুনি ভোরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এক শিশু। বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় আর মা চন্দ্রমণি দেবীর সেই সন্তান আজ বিশ্বজুড়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নামে পরিচিত। আজ তাঁর ১৯১তম জন্মতিথি। গদাধর চট্টোপাধ্যায় ওরফে ‘গদাই’ থেকে কীভাবে তিনি আধ্যাত্মিক জগতের ধ্রুবতারা হয়ে উঠলেন, সেই যাত্রাপথ আজও বিস্ময় জাগায়। রামকৃষ্ণের জন্ম ঘিরে রয়েছে অলৌকিক আখ্যান। জনশ্রুতি আছে, তাঁর জন্মের আগে মা চন্দ্রমণি দেখেছিলেন শিবলিঙ্গ থেকে নির্গত এক দিব্যজ্যোতি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে, বাবা ক্ষুদিরাম গয়ায় গিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন গদাধর বিষ্ণুকে। সেই স্মৃতিতেই ছেলের নাম রাখেন গদাধর। গ্রামবাসীদের কাছে তিনি ছিলেন আদরের গদাই। ছোটবেলা থেকেই প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর মন ছিল না।
সোজাসাপটা ভাষায় তিনি একে বলতেন ‘চালকলা-বাঁধা বিদ্যা’। অর্থ উপার্জনের শিক্ষার চেয়ে তাঁর টান ছিল গান, যাত্রা আর লোকগাথার প্রতি। যৌবনের শুরুতেই তিনি পা রাখেন কলকাতার দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে। রানি রাসমণি নির্মিত এই মন্দিরে কালীর আরাধনায় মগ্ন হন তিনি। দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই পা রেখেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে। সেখানে দাদা অসুস্থ হলে একদিন তিনি দেবীকে সেবা করার সুযোগ পেলেন। কথিত আছে, নিয়ম-কানুন না মেনেই দেবী কালিকাকে পুজো করেন গদাই। আর তা দেখে ক্ষুব্ধ হন রামকুমার। পরবর্তীকালে, সেই গদাধরই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরের দেবী মাহাত্ম্য। সংকীর্ণতা কাটিয়ে মানুষের মনকে আলোর দর্শনে প্লাবিত করেছিলেন তিনি। মন্দিরের এক চিলতে ঘরেই কেটেছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু গদাধর থেকে ‘রামকৃষ্ণ’ হয়ে ওঠার নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত। কেউ বলেন রানি রাসমণির জামাতা মথুরবাবু তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন। আবার অনেকের মতে, তাঁর সন্ন্যাস গুরু তোতাপুরী তাঁকে এই নামে ভূষিত করেন। সংসারের মায়ায় ফেরাতে ২৩ বছর বয়সে ৫ বছরের সারদামণির সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই দাম্পত্য ছিল অলৌকিক। স্ত্রীকে তিনি ‘জগজ্জননী’ রূপে পূজা করেছিলেন। ষোড়শী পূজার মাধ্যমে সারদা দেবীকে বসিয়েছিলেন দেবীর আসনে। ত্যাগ আর ভক্তির এমন নজির ইতিহাসে বিরল।